কুইনিন সারাবে কে?


২ জুন, ২০১৯ ৬:০১ : অপরাহ্ণ

।।ইয়াসীন হীরা।।
দেশের সব গোয়েন্দা সংস্থা তাদের নিজস্ব লোকবল দিয়ে ইয়াবা কারবারিদের আলাদা আলাদা তালিকা করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে ওই সব তালিকা সমন্বয় করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে একটি চুড়ান্ত তালিকা তৈরী করে। ৭৩ জনের ওই তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে টেকনাফ-উখিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি’র নাম। সে কারণে বির্তক এড়াতে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ। মনোনয়ন পেয়েছেন তার স্ত্রী। নির্বাচিতও হয়েছেন। স্ত্রী সাংসদ হলেও বদির ক্ষমতা ও প্রভাব কমেনি, বরং ক্ষেত্র বিশেষে বেড়েছে!
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ওই গডফাদারের তালিকায় দ্বিতীয় নম্বরে রয়েছে সিআইপি সাইফুল করিম। যিনি গত ৩০ মে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্ধুকযুদ্ধে নিহত হন। নিহত হওয়ার তিনদিন আগে (২৭ মে) দীর্ঘ ৯ মাস বিদেশে পলাতক থাকা অবস্থায় ঢাকা আসেন সাইফুল। ঢাকা বিমান বন্দর থেকে পুলিশ তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় অন্যত্র নিয়ে যায় বলে দাবি করেন সাইফুলের পরিবার। তবে পুলিশের দাবি ৩০ মে তাকে আটক করে রাতে অভিযানে যায়। আর সেখানে সাইফুলের লোকজন তাকে ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা চালায়। পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে নিহত হয় সাইফুল। উদ্ধার করা হয় বিপুল ইয়াবা ও অস্ত্র-গোলাবারুদ। হঠাৎ সাইফুল নিহত হওয়ার ঘটনাটি ‘টক অব দি কান্ট্রি’তে পরিণত হয়।

এমন মৃত্যু কাম্য না হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, সাধারণ মানুষ এতে খুশি হয়েছে! মানবাধিকার সংগঠনগুলোও নিরব। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, সরকার মাদকের বিষয়ে যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। তার প্রতি গণ মানুষের শতভাগ সমর্থন রয়েছে। সাইফুল করিম এর পরিণতি এমন হবে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এতে সরকারের জনসমর্থন বেড়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে সাধারণ মানুষ একটি তির্যক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, তালিকার দুই নম্বরে থাকা সাইফুল করিম বিদেশে পালিয়ে গেয়েও রক্ষা পেলেন না। সেখানে এক নম্বর তালিকায় থাকা আবদুর রহমান বদি প্রকাশ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে কী ভাবে?

বদি ও সাইফুল  দু’জনের মধ্যে বেশ মিল রয়েছে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারি! ইয়াবা কারবারি দু’জনই হাজী পদবি বহন করেন। তারা শত কোটি টাকার মালিক। সর্বোচ্চ কর দাতার পুরস্কার পেয়েছেন কয়েক দফা। সেই সূত্রে হয়েছেন কমার্শিয়াল ইম্পটেন্ট পার্সন (সিআইপি)। পরিবারে সদস্য ও স্বজনদের বেশিরভাগই ইয়াবার সঙ্গে জড়িত। বলা যায় দু জনেরই পরিবার ইয়াবা বান্ধব। শুধু কী তাই দু’জনেরই নারীর প্রতি অন্যরকম ভাললাগা, ভালবাসা রয়েছে। সাইফুল তো তার ফেসবুক একাউন্টে লিখেই দিয়েছেন নারীর প্রতি তার আগ্রহের বিষয়টি। দুই জনই সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকায় বদি ছাড়াও তার পাঁচ ভাই আবদুল শুক্কুর, আবদুল আমিন, মৌলভি মুজিবুর রহমান, মো. সফিক, মো. ফয়সাল, ভাগনে সাহেদুর রহমান নিপু (ওসি আবদুর রহমানের ছেলে), বেয়াই শাহেদ কামাল, ফুফাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেলসহ ঘনিষ্ঠ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।

অন্যদিকে সাইফুল করিম ছাড়াও তার ৬ ভাইয়ের নাম রয়েছে, ইয়াবা কারবারির তালিকায়। এরা হচ্ছে রফিক, মুন্না, জেড করিম মাহবুব, মিকি ও রাশেদ। আত্বীয় স্বজনতো আছেই। ১৯৯৭ সাল থেকে সাইফুল করিম ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পরে যুক্ত হন বদি। আত্মীয় স্বজন বেশি ও প্রশাসনিক প্রভাব থাকায় ইয়াবা কারবারে পরে এসেও প্রথম হয়ে যান বদি। অবশ্য তাদের দু’জনকে ইয়াবার জনকও বলা হয়। তারা যৌথভাবে এ দেশের উঠতি বয়সী যুবক যুবতিদের ইয়াবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। অমিল শুধু একজন পালিয়েও বাচঁতে পারেননি। অন্যজন আছেন বহাল তবিয়তে, খোশ মেজাজে!

ইয়াবা সাম্রাজ্য গড়ে তোলার কাজে সাইফুল করিমকে সহায়তা দেন তার মামা আব্দুর রহিম। যিনি মিয়ানমারের বাসিন্দা। “সীমান্তের ওপারে যে ৩৭টি ইয়াবা কারখানা রয়েছে আব্দুর রহিম সেগুলোর প্রধান ডিলার’’। টানা ২২ বছর সাইফুল করিম রাজত্ব করেন ইয়াবা রাজ্যে। বিপুল অবৈধ অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছেন।এমন বিত্তশালী সাইফুল করিম নিহত হওয়ার পর আরো একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সেটি হচ্ছে, কেন তিনি (সাইফুল) দেশে আসলেন ? এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। অনেকে মন্তব্য করেছেন বদিই তাকে টোপ দিয়ে দেশে এনেছেন। যদিও বদি তা অস্বীকার করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১০২ মাদক ব্যবসায়ি আত্মসমর্পণ করেন। তাতে বদির কয়েকজন স্বজনও রয়েছে। সাইফুলকে বলা হয়েছিল আত্মসমর্পণ করলে রক্ষা পাবে তার সবকিছু। সেই সূত্রে তিনি দেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন। আর ওই সুয়োগটি গ্রহণ করেছিল আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।

উল্লেখ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় সাবেক সাংসদ বদিসহ তাঁর পরিবারের অন্তত ২৬ জনের নাম আছে। তবে সাবেক এ সাংসদ আব্দুর রহামান বদি’র দাবি, কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আড়াল করতে তাকে সহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছেন । তালিকার ৬ নম্বরে আছে টেকনাফ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাফর আহমদের নাম। তিনি সাংসদ বদির ঘনিষ্ঠ। ৭, ৮ ও ৯ নম্বরে আছে জাফর আহমদের চার ছেলে মোস্তাক মিয়া, দিদার মিয়া, মো. শাহজাহান (টেকনাফ সদর ইউপি চেয়ারমান) ও মো. ইলিয়াছের নাম।

ইয়াবার দ্বিতীয় গডফাদার সাইফুল করিম নিহত হওয়ার পর টেকনাফ কক্সবাজারসহ দেশের সব ইয়াবা ব্যবসায়ি চরম আতঙ্কে রয়েছে। তাদের কাছে একটি মেসেজ গেছে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক আশ্রয় ছাড়া ইয়াবা বেচা-বিক্রি করে রক্ষা পাওয়া যাবে না। এটি বিশ্বাস করতে চায় পুরো জাতি। অনেকে বলছেন, ইয়াবার আগ্রাসন বন্ধ করতে হলে আবদুর রহমান বদি, তার স্বজন এবং নিহত সাইফুল করিম এর স্বজনদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। এটি না হলে সীমান্তে কড়াকড়ি, সড়ক ও নৌ পথে চেকপোস্ট বসিয়ে ইয়াবা আগ্রাসন বন্ধ করা সম্ভব নয়। তালিকায় এক নম্বরে থাকা আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের সংশয় সন্দেহ দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন ওঠেছে, কুইনিন জ্বর সারায়, কিন্তু কুইনিন সারাবে কে? শুধু রাজনৈতিক কারণেই কী বদি পার পেয়ে যাচ্ছেন?

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

ট্যাগ :

আরো সংবাদ