ব্রেকিং নিউজ

নারীর ক্ষমতায়ন: বিশ্ব প্রেক্ষাপট


৯ জুন, ২০১৯ ১২:২৩ : অপরাহ্ণ

।।ইয়াসীন হীরা।।
বর্তমান বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের সংবিধানে কার্যত না-হলেও অন্তত তত্ত্বগতভাবে নারী-পুরুষের রাজনৈতিক সমতার কথা বলা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে ১৯৭২-এর সংবিধানে জনজীবনের সকল স্তরে অংশগ্রহণে নারীদের সমঅধিকারকে পূর্ণ স্বীকৃতি ও নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এ-সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮ (১)-এ বলা হয়েছে: “রাষ্ট্র ধর্ম, বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বৈষম্য প্রদর্শন করবে না।” অনুচ্ছেদ ২৮ (২)-এ বলা হয়েছে: “নারীরা রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে অবশ্যই সমঅধিকার পাবে।” অধিকন্তু অনুচ্ছেদ ৯, ১০, ৩৭, ৩৮,৩৯-এ সুস্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে যে, “রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের সকল স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।”

নারী অধিকার সুরক্ষা ও নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য দূরীকরণের জন্যে সংবিধানে এতসব নিশ্চয়তা ও নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশি নারীরা এখনও তাদের তাদের প্রাপ্য বিভিন্ন সুবিধা এবং পুরুষদের সমান অধিকার লাভ করে নি। ফলত তারা উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সমভাবে অংশ নিতে পারছে না। তবে আশার কথা হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ অনেক গণতান্ত্রিক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়তায়নের দিক থেকে এগিয়ে আছে।
বাংলাদেশের প্রধান তিনটি দলের শীর্ষে আছেন তিন নারী। দুজন তিনবার করে প্রধানমন্ত্রীর এবং বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আরেকজন এখন সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। দেশ পরিচালনায় তাঁরা সর্বোচ্চ শক্তিধর বলে বিবেচিত। গত দুই দশক ধরে আধুনিক মুসলিম দেশে টানা নারী শাসিত দেশ বিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই!

আন্তঃ সংসদীয় ইউনিয়ন (আইপিও) পরিচালিত সর্বশেষ (২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি) এক জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের ১৯০টি দেশের সংসদে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৪৪ হাজার ৯ শ’ ৯৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৫ হাজার ৪ শ’ ২৭ জন। নারী ৯ হাজার ৯ শ’ ২৯ জন (২২.১%)। এর মধ্যে একক পার্লামেন্ট (সিঙ্গেল হাউজ বা নিম্নকক্ষ) ৩৮ হাজার ৪৪ জন এমপি রয়েছে। এতে পুরুষ ২৯ হাজার ৫শ’ ৩৯ জন। নারী ৮ হাজার ৫শ’ ৫ জন (২২.৪)%। সিনেটে (উচ্চ কক্ষ) ৬ হাজার ৯ শত ৩২ জন এমপি’র মধ্যে পুরুষ ৫ হাজার ৫ শ’ ৮ জন এবং ১ হাজার ৪ শ’ ২৪ জন নারী (২০.৫%)।
বিশ্বব্যাপি ১৯০ দেশে একক পার্লামেন্ট’এ (সিঙ্গেল হাউজ) নারীর প্রতিনিধিত্ব হিসেবে শীর্ষ দশটি দেশ হচ্ছে, রোয়ান্ডা (৬৩.৮%), ভলিভিয়া (৫৩.১%), এনডোরা (৫০%) কোবা (৪৮.৯%), সিসিলি (৪৩.৮%), সুইডেন (৪৩.৬%), সেনেগাল (৪২.৭%), ফিনল্যান্ড (৪২.৫%), ইকোডর (৪১.৬%) এবং দক্ষিণ আফ্রিকা (৪১.৫%)।

অবাক হলেও সত্য, সংসদের আসন ভিত্তিতে নারীর ক্ষমতায়নে এগিয়ে আছে এক সময়কার তালেবান শাসিত আফগানিস্তান। দেশটির অবস্থান ৩৯তম। ২৪৯ জনের মধ্যে ৬৯জন নারী (২৭.৭ শতাংশ)। এ দেশটি নারী ক্ষমতায়নে ভেটো ক্ষমতার অধিকারি ফ্রান্সের থেকেও ছয় ধাপ এগিয়ে আছে। ফ্রান্স অবস্থান করছে ৪৫তম। ৫৭৭ জনের মধ্যে নারী ১৫১ জন (২৬.২ শতাংশ)। রক্ষনশীল ও ইসলামী রাষ্ট্র ইরাকের অবস্থান ৪৪তম। ৩২৮ জনের মধ্যে নারী ৮৭ জন (২৬.৭ শতাংশ)। একই স্থানে রয়েছে আরেক মুসলিম দেশ সাউথ সুদান। ৩৩২ জনের মধ্যে নারী ৮৮ জন (২৬.৭ শতাংশ)। দক্ষিণ এশিয়ার রক্ষণশীল মুসলিম দেশ পাকিস্তান এর অবস্থান ৬৪তম। ৩২৩ জনের মধ্যে নারী ৬৭ জন (২০.৭ শতাংশ)। কমিউনিস্ট শাসিত চিনের অবস্থান ৫৩তম। ২৯৫৯ জনের মধ্যে নারী ৬৯৯ জন (২৩.৬ শতাংশ) নারী আন্দোলনের রেঁনেসা খ্যাত যুক্তরাজ্যের অবস্থান ৫৬তম (২২.৮শতাংশ)।

বিশ্বে মর্ডান মুসলিম দেশ খ্যাত বাংলাদেশের অবস্থান ৬৮তম। ৩৫০ জনের মধ্যে নারী ৭০ জন (২০ শতাংশ)। নারীর ক্ষমতায়নে পিছিয়ে নেই রাজতন্ত্রের নেতৃত্বে শাসিত ইসলামী রাষ্ট্র সৌদি আবর। বাংলাদেশের পরের স্থানটি সৌদি আরবের। ৬৯ তম স্থানে অবস্থানকারি দেশটিতে ১৫১ সদস্যের নীতি নির্ধারনী ফোরামে ৩০ জন নারী রয়েছেন (১৯.৯ শতাংশ)। এটি অনেকের অজানা। সৌদি সরকার নারী ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে ২০০৯ সাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরবে নোরা আল্ ফয়েজ নামে এক নারী ২০০৯ সাল থেকে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের অধীন নারী বিষয়ক উপমন্ত্রীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নারীদের স্থানীয় পৌরসভার নির্বাচনে অংশগ্রহণ, গাড়ী চালানোর সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের চার ধাপ  পিছিয়ে আছে আধুনিক চিন্তা চেতনা ও গণতান্ত্রিক দেশ খ্যাত খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ দেশটির অবস্থান ৭২তম। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট এর নিম্ম কক্ষের ৪৩৫ জনের মধ্যে নারী মাত্র ৮৪ জন (১৯.৩ শতাংশ)। উচ্চ কক্ষ (সিনেট) ১০০ জনের মধ্যে নারী রয়েছে ২০ জন (২০ শতাংশ)। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে সমাজতান্ত্রিক ধ্যান ধারণায় প্রতিষ্ঠিত বর্তমান গণতান্ত্রিক রাশিয়ান ফেডারেশনের অবস্থা আরো খারাপ। ৪৫০ জনের মধ্যে নারী রয়েচেন ৬১ জন (১৩.৩ শতাংশ)

ধর্মনিরপেক্ষ ও সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার দেশ নারীর ক্ষমতায়নে অনেক পিছিয়ে আছে ভারত। এ দেশটির অবস্থান ১০৩ তম (১১শতাংশ)। এতে দেখা যায়, নারীর ক্ষমতায়নের দিক থেকে ভারত এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টে নিম্মকক্ষ (লোকসভা) ৫৪৩ জনের মধ্যে ৬৫ জন নারী (১২ শতাংশ)। উচ্চকক্ষে (বিধান সভা) ২৪৩ জনের মধ্যে নারী ৩১জন (১২.৮ শতাংশ)। ১৯৪৮ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দেশটিতে গণতন্ত্র চর্চা একবারে জন্য থেমে থাকেনি। ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও রক্ষণশীল সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ভারতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হোঁচট না খেলেও নারী প্রগ্রতি-উন্নতি হোঁচট খেয়েছে বারবার। হিন্দু মৌলবাদ দেশটির নারী ক্ষমতায়নে অন্তরায় হয়ে ওঠেছে। সেকারণে ভারতে যতটুকু নারী জাগরণ ও ক্ষমতায়নের সূচক বাড়ার কথা ছিল তা বাড়েনি, বরং কমেছে। ভারতের সঙ্গে একই অবস্থানে রয়েছে আরব বসন্তের দেশ খ্যাত মুসলিম দেশ জর্ডান। দেশটির ১৫০ জনের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে ১৮ জন নারী রয়েছেন।

বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে মাত্র ৪টি দেশে কোন নারী সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে এখনো যুক্ত হতে পারেনি। এগুলো হচ্ছে, কাতার, টুংগা, ভেন্যুায়াতা ও মাইক্রোসিয়া। ১৮৬টি দেশে নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কমবেশী যুক্ত রয়েছেন।

বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইংরাজ আমলে হিন্দু নারীদের সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে এদেশে নারীর ক্ষমতায়নের প্রাক পর্ব শুরু হলেও নারীরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান ছিল না। ১৯৪৮ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট পাকিস্তান ও ভারত বিভক্ত স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার ৫ বছর পর পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন ১৯৫৪ সালে এ-দেশের নারীরা প্রথম ভোট দেয়। সেবার নারীদের জন্যে ১০টি আসন সংরক্ষিত থাকা সত্ত্বেও একজন মাত্র নারী নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের যুগান্তকারী সাধারণ নির্বাচন ১৯৭০-এও নারীরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে।

বাংলাদেশের নারীরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। স্বাধীনতার জন্য নারীদের কেউ জীবন দিয়েছে, কেউ হারিয়েছে ইজ্জত। দেশ গঠনে  ধীরে ধীরে নারীরা ঘরে চৌকাঠ পেরিয়ে বেরিয়ে আসে। অংশ নেন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে। উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মূলধারায় নারীদের চালিত করা, লিঙ্গ সাম্য প্রতিষ্ঠা ও নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশ, বিশ্বের গুটিকয় দেশের অন্যতম যেখানে নারীদের জন্যে পৃথক একটি মন্ত্রণালয় আছে। কার্যত ১৯৮০’র দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ ছিলো অস্বাভাবিক ও ন্যূনতম। তখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণকে ব্যাপকভাবে নিরুৎসাহিত ও অস্বীকার করতো। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো নারী-পুরুষ সমতা তত্ত্বে বিশ্বাস করতো না, এবং রাজনীতিতে নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ ‘অনৈসলামিক’ বা ‘ইসলাম-বিরোধী’ কাজ হিসেবে গণ্য করতো। সময়ের প্রয়োজনে তারাও নারী বিষয়ে প্রগতিশীল চিন্তা করতে শুরু করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে তাদের মজলিশে আমলায় ৯ জন নারী রয়েছেন।

সামাজিক নিরাপত্তার লক্ষে ১৯৮০’র যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন (১৯৮২-তে সংশোধিত) এবং নারীর প্রতি সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষে ১৯৮৫ সালে জারি করা হয় পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ। নারী-পুরুষের বৈষম্য নিরসনের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্যে জাতীয় নারী উন্নয়ন পরিকল্পনা, পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, জাতীয় নারী নীতি ১৯৯৭ প্রণয়ন করা হয়। ১৯৯৫ সালের জাতিসংঘ প্রণীত মানব উন্নয়ন রিপোর্টটি প্রকাশের পরে উন্নয়নের সঙ্গে জেন্ডার-ধারণাকে যুক্ত করার বিষয়টি অবশ্য আরো গতি পায়। রিপোর্টে মানবসমাজের অংশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অপরিহার্য পক্ষ হিসেবে নারীকে বিবেচনা করা হয়।

নারীর রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে নারীবর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। এ সময়েই অনুষ্ঠিত হয় মেক্সিকোতে প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলন, যেখানে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। ফলশ্রুতিতে দেশের বাইরে চলমান নারী উন্নয়ন কর্মকান্ডে সাথে বাংলাদেশও সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।

১৯৮০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় নারী সম্মেলনে জাতিসংঘ ঘোষিত নারীদশক (১৯৭৬-৮৫)- এর প্রথম ৫ বছরের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। জাতিসংঘের সমাজে বিদ্যমান নারী-পুরুষের মধ্যে বিভিন্ন বৈষম্যের বিলোপ সাধনে প্রণীত সনদে এ বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে ১৯৮৪ সালে। ১৯৮৫ সালে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে তৃতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে সমতা, উন্নয়ন ও শান্তির লক্ষ্যে নাইরাবি অগ্রমুখী কৌশল গৃহীত হয়। বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিকে গৃহীতব্য পদক্ষেপসমূহ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। ২০০০সালে অনুষ্ঠিত মিলেনিয়াম সামিটের অধিবেশনে বাংলাদেশ অপশনাল প্রটোকল অন সিইডিএডব্লিও স্বাক্ষর করে। গুরুত্বপূর্ণ এ সনদে স্বাক্ষরকারী প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে।

বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের প্রেক্ষাপট অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন সমূহ নারীদের সচেতনতা ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে আশির দশক থেকে কাজ করে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রক্ষণশীল মুসলিম হওয়া সত্ত্ব্ওে গতানুগতিক পর্দা প্রথা ভেঙে নারীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসেছে। অংশ নিচ্ছে নানা জাতিগঠনমূলক কর্মকান্ডে। নারীরা সম্পদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বা মালিকানা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। অর্থনৈতিক লেনদেনে তাদেরকে সম্পৃক্ত করেছে। বিশেষ করে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিয়ে, প্রজনন ও জন্মশাসনে নিজেদের মতামত, আইনের সহায়তা নেয়ার ক্ষমতা, নিজের অবস্থান উত্তরণ সম্পর্কে উপলব্ধি ও অবলোকণ করতে সক্ষম হয়েছে।

১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২০৯ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৩ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন কিন্তু কেউ নির্বাচিত হয়নি। তবে প্রথমবারের মতো সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারী সংসদে বসার সুযোগ পান ১৫ জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামীলীগ। ২জন নারী মন্ত্রী হন। এরা হচ্ছেন, বদরুন্নেছা আহমেদ ও বেগম নুর জাহান মোর্শেদ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দশটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ দশম সংসদে সরাসরি ও সংরক্ষিত মিলিয়ে ৭০ জন নারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে।

নারীর এ অগ্রগতির পিছনে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পাশাপাশি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে! পেশী শক্তিমুক্ত, সুষ্ট পরিবেশ, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতার কারণে ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত (৬ষ্ট ও দশম সংসদ বাদে) প্রতিটি নির্বাচনে নারীর উপস্থিতির হার ছিল উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া এ সময়ে নারীর প্রতি ধর্মীয় গোড়ামী, সামাজিক-পারিবারিক কুসংস্কার ও পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন হয়েছে। নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এগিয়ে এসেছে। নারীকে পণ্য কিংবা দাসী হিসেবে না ভেবে অর্থনৈতিক হাতিয়ার তথা মানব সম্পদ হিসেবে ভাবা হচ্ছে। উল্লেখ বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব আয়ের ৭৭.২৩ শতাংশ আসে পোষাক শিল্প থেকে। এ শিল্পে সঙ্গে জড়িতদের ৯০শতাংশ নারী। তাদের শ্রমে-ঘামে সচল এবং পুষ্ট হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। মুলত: অর্থনৈতিক প্রয়োজনে নারী ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে, তারই ধারাবাহিকতায় নারীরা রাজনীতিতে এগিয়ে আসছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগণ। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের মতো ইসলামি মূল্যবোধের আধিপত্যপূর্ণ দরিদ্র ও ‘মুসলিম-প্রধান’ রাষ্ট্রে নারীর ক্ষমতায়নের এমন অগ্রগতি খুবই আশাব্যঞ্জক।

লেখক: ইয়াসীন হীরা, সাংবাদিক ও গবেষক

ট্যাগ :

আরো সংবাদ