ব্রেকিং নিউজ

সরিষায় ভূত, না ভূতে সরিষা?


১১ জুন, ২০১৯ ৯:২০ : অপরাহ্ণ

।।ইয়াসীন হীরা।।
ঘুষ। এটি বাংলা শব্দ। বাংলাদেশের মানুষ কম-বেশি এ শব্দটির সঙ্গে বেশ পরিচিত। প্রতিদিনই দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কোটি কোটি টাকা ঘুষ লেন-দেন করছেন। এ যেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। চিরন্তন সত্য! কেউ দিচ্ছে, কেউ নিচ্ছে । এক কথায় ঘুষ হচ্ছে, গোপনে দেয় অবৈধ পারিতোষিক। কিন্তু ঘুষ দেয়া-নেয়া এখন ওপেন-সিক্রেট।গত সোমবার পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট গ্রেফতার হয়েছেন ক্ষমতায় থাকাকালে লাখ লাখ রুপি ‘কিকব্যাক’ গ্রহণের অভিযোগে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘুষকে হারাম ঘোষণা করেছেন (সূরা আল বাক্কারা ২: ১৭৫)। শুধু ইসলাম ধর্মে নয়- সব ধর্মে ঘুষকে অবৈধ ও অনৈতিক এবং পাপ বলে অবহিত করেছেন। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেও ঘুষ আদান-প্রদান দন্ডনীয় অপরাধ। দন্ডবিধি ১৬২ ধারায় উল্লেখ আছে, কোন সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তা কাউকে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা, বিনিময়ে, অথবা সুযোগ-সুবিদার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ বা বখশিস, উপঢৌকন গ্রহণ করে সে ক্ষেত্রে গ্রহীতার তিন বছরের কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। এটি সাধারণ মানুষ না জানলেও সরকারি কমচারি-কর্মকর্তারা ঠিকই জানেন। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি চাকুরিতে ঘুষ গ্রহণ ও প্রদান চাকুরির অংশ হয়ে গেছে! এমন কিছু চাকুরি আছে, যেখানে চাকুরি করলে বিপুল ঘুষ পাওয়া যায়। এ সব চাকুরিতে সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগীতা হয়। চাকুরি পাওয়ার ঘুষের পরিমাণ বেশি এমন স্থানে পোস্টিং এবং একই পদে দীর্ঘদিন থাকার জন্য শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঘুষ দেয়া সবই হয় প্রকাশ্যে।

এক কথায় পিয়ন থেকে শুরু করে শীর্ষ পদে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষই যেন প্রাণ। তবে ব্যতিক্রমও আছে। তারা কোনঠাসা। সমাজ, রাষ্ট্র তাদের মূল্যায়ণ করে না। মূল্যায়ণ হয়, ঘুষ প্রদানকারি ও গ্রহীতাদের! এমন অভিযোগ প্রায় শোনা যায়। কিন্তু রাষ্ট্র লাগামহীন ঘুষ, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সম্পদ অর্জন রোধ করতে স্বাধীন, আলাদা একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আর সেটি হচ্ছে দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ প্রতিষ্ঠানের কর্মরত কর্মকর্তাদের সাধারণ মানুষ আলাদা মর্যদার চোখে দেখে থাকে। তারা অন্যদের দূর্নীতি, অনিয়ম রোধ করে। কিন্তু তারা যখন অনিয়ম, দূর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। সর্বত্র অনিয়ম, দূর্নীতি ঘুষ জীবনের অংশ হয়ে যায়। হয়েছেও। দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর অনেকে বিশেষ করে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ ঘুষের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেছে। প্রমাণ না থাকায় গণমাধ্যম সমূহ এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে।

ডিআইজি মিজান একজন দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা।এতে কোন সন্দেহ নেই। দ্বিতীয় বিয়ে গোপন করতে গিয়ে তিনি মরিয়ম নামে এক নারীকে নির্যাতন করেন এবং তাকে গ্রেফতার করান মিথ্যা মামলায়। অসংখ্য নারী তার লালসার শিকার হয়েছেন। বাদ যায়নি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপিকাও। ওই উপস্থাপিকা মিজানের বিরুদ্ধে বিমান বন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এ সব বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তাকে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত আয় ও সম্পদ রয়েছে এমন অভিযোগে মামলা হয়। ডিআইজি মিজানুর রহমান থেকে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এনামুল বাছির ঘুষ নেওয়ার পরও অব্যাহতি দিতে পারেনি। এ অবস্থায় মিজানুর রহমান নিজেই তা ফাঁস করে দিয়েছেন সব কিছু।

পুলিশের সঙ্গে দুদক কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাছিরের কথোপকথনসহ একটি প্রতিবেদন প্রচার করা হয় একটি বেসরকারি টেলিভিশনে। এটি প্রচারের পরপরই (গত ৯ জুন) একটি তদন্ত কমিটি করে দুদক। তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটিতে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখতকে প্রধান করা হয়। তদন্ত কমিটি ১০ জুন কমিশনে প্রতিবেদন দেয়। সেই প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে খন্দকার এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এতে দুদুকের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঘুষের টাকা নিয়েছেন কীনা, নিলে সেই টাকা কোথায় আছে, এ বিষয়ে আলাদা তদন্ত হবে বলে জানিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ।

দুদকের ৮৭৪ জন কর্মীর সততার নিশ্চয়তা কমিশন দিতে পারে না। যদি তাই হয়, দুদক দেশের ঘুষ দূর্নীতি বন্ধ করবে কীভাবে? ‘ফরেনসিক রিপোর্ট ছাড়া ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের মধ্যে ঘুষ লেনদেনের অডিও ক্লিপের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়ের মন্তব্য করা মুশকিল বলে জানান তিনি। দুদক চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্যকে ‘আমলাতান্ত্রিক কৌশল’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ডিআইজি মিজানের দাবি, দুই দফায় টাকা নিয়েছেন এনামুল বাছির। প্রথম দফায় গত ১৫ জানুয়ারি ২৫ লাখ টাকা নেন তিনি। একটি বাজারের ব্যাগের করে রমনা পার্কের রমনা রেস্টুরেন্টে এই টাকা নিয়ে আসেন ডিআইজি মিজানুর। বাকি ১৫ লাখ টাকা দেন ১ ফেব্রুয়ারি। তাদের সম্পর্ক এতটায় সূদৃঢ় ছিল যে ঘুষ নেওয়ার পর টাকা কোথায় রাখবেন, বিষয়টি নিয়েও ডিআইজি মিজানের সঙ্গে পরামর্শ করেন এনামুল বাছির। তখন সাউথ-ইস্ট ব্যাংকে অন্য একজনের অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার কথা বলা হয়। শুধু তা-ই নয়, ভবিষ্যতে আরও কারও কাছ থেকে এভাবে ঘুষ নিয়ে যেন অ্যাকাউন্টে রাখতে পারেন, সে ব্যাপারেও কথা হয়। ছেলের স্কুলে যাওয়ার জন্য একটি গাড়িও চান এনামুল বাছির। এটি যেন যেই সরিষা দিয়ে ভূত তাড়ানো হয়, সেই সরিষার ভিতরে ভূতের বসবাস এর ঘটনা!

দুদক কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার বিষয়ে ডিআইজি মিজানুর রহমান বলেন ‘আমি আমার সেফটির কথা ভেবে এটা করেছি। তিনি যে দুর্নীতিবাজ, তা প্রমাণ করার জন্য আমি এটা করেছি।’ ঘুষ দেওয়ার জন্য এত টাকা কোথায় পেলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি মিজান বলেন, ‘টাকাটা আমার আত্মীয়-স্বজনের কাছে ধার করা।’ আমি শুধু তাদের কাছে ল’ফুল হেল্প চাই। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা তো দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে পারেন না।’ মন্তব্য মিজানের।

মিজানুর যে মুঠোফোন নম্বরে এনামুলের সঙ্গে কথা বলেছেন, সেটি কখন, কোথায় ব্যবহৃত হয়েছে খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ফোনের সিম তাঁর গাড়িচালকের নামে তোলা হলেও সেটি ব্যবহৃত হয়েছে দুদক কার্যালয়, রমনা পার্ক এবং এনামুল বাছিরের বাসায়। এর মাধ্যমে মিজান পরিস্কার করেছেন তিনি সত্যি সত্যি এনামুল বাছিরকে ঘুষ দিয়েছেন। যদিও এসব মিজানের বানানো, সাজানো বলে অবহিত করছেন ৪০ লাখ টাকা নেয়া সেই দুদক পরিচালক। তার দাবি, মিজানের ৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রয়েছে।

প্রশ্ন ওঠেছে, দুদুকের তদন্ত কর্মকর্তাকে দূর্নীতিবাজ প্রমাণ করার জন্য কী ডিআইজি মিজানুর রহমান দুই দফায় ৪০ লাখ দিয়েছেন? মিজান এতটা পটু যে, আলোচনার সুবিধার্থে নিজের ড্রাইভারে নামে সিম কিনে তা দুদক পরিচালককে দিয়েছেন দামি সামসং ফোনসহ। যাতে দুজনের কথা যেন ফাঁস হয়ে না যায়। প্রশ্ন হলো তিনি ঘুষ গ্রহণকালে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে ধরিয়ে দিলেন না কেন? তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিলের পরই তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে তার রেকর্ড করা অডিও ক্লিপ সরবরাহ করেন এবং পরে সাক্ষাৎকার দেন। শুধু তাই নয়, দুদুক পরিচালক তার স্ত্রীর দোকানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছেন সেই সিসিটিভি ফুটেজও সরবরাহ করেন মিজান।

তিনি আরো দাবি করেছেন, এনামুল তাকে জানিয়েছেন গত ২ জুন তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারের চাপে তাকে অব্যাহতি দিতে পারেনি। এতে এটি প্রমাণিত হয়, দুদুক কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে না পারায় তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে ঘুষ লেন-দেন সংক্রান্ত বিষয়টি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তৎকালীন পিজি থেকে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) স্নাতকোত্তর খন্দকার এনামুল বাছিরের পড়াশোনা শেষ হয় ১৯৮৮ সালে। ১৯৯১ সালে তিনি দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে যোগ দেন। ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ দুর্নীতি দমন কমিশন হয়। দুদকের আইন বিভাগের উপ-পরিচালকও ছিলেন তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশন হলে আইন বিভাগের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রমোশন পেয়ে পরিচালক হন। তাঁর চাকরি আছে মাত্র তিন বছর। এ অবস্থায় পরবর্তী জীবনে ভোগ-বিলাস করতে বাড়ি-গাড়ির মালিক হতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ধরা খেয়ে আম-ছালা দুটোই গেছে এনামুলের। তার বিরুদ্ধে মামলা ও শাস্তি এখন সময়ের ব্যাপার।

প্রসঙ্গত: ৩৫০ কোটি টাকা উদ্ধার সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্ত দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এর আগেও ৪০ মাস সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। পরে চাকরিতে পুনর্বহাল হন এবং পদোন্নতি পান। রাজধানীর মোরাদিয়ায় ৬ শতাংশ জমির ওপর স্থাপিত একটি স্কুল ছাড়া তার স্ত্রী নামে উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। স্ত্রী রুমানা শাহীন শেফা মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। রুমানা শাহীন শেফার নামে সার্ভিস অ্যাকাউন্টের বাইরে সোনালী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকে দু’টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে।

খন্দকার এনামুল বাছির ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে স্ত্রী শেফাকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বানাতে চেয়েছিলেন। লেনদেনের অভিযোগ উঠলে গত ২৯ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে।

পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার অভিযোগ থেকে রক্ষা পেতে একজন সরকারি কর্মচারি হয়ে অন্য এক সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার স্বীকাররোক্তি দিয়েছেন । এতে সরকারি বিধির শৃঙ্খলা ভঙ্গ হওয়ার পাশাপাশি চাকুরিতে বহাল থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন তিনি। তারপরও ডিআইজি মিজান এখনো স্বপদে বহাল আছেন। তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এটি সরিষায় ভূত, না ভূতে সরিষা তা জানতে আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

আরো সংবাদ