ব্রেকিং নিউজ

উপহার সাংসদ এবং তার ‘অবৈধ’ সংসদ


১২ জুন, ২০১৯ ৮:৫৩ : অপরাহ্ণ

।। ইয়াসীন হীরা।।
রুমিন ফারহানা। ভাষা সৈনিক অলি আহাদের কন্যা। হোলি ক্রস স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ভিকারুন নিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে স্নাতক এবং যুক্তরাজ্যের লিংকনস্ ইন থেকে বার এট ল ডিগ্রি অর্জন করেন। এখন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী।অধুনা লুপ্ত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র কেন্দ্রীয় কমিটির আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক। অনেক গুনের অধিকারি তিনি। রাজনীতিতে নবীন হলেও টেলিভিশনের টক-শো গুলোতে তার সরব উপস্থিতি দেখা যায়। যুক্তিমূলক উপস্থাপন, বাচনভঙ্গি, বাকপটুতার কারণে রাজনীতি ও সুধী সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রুমিন ফারহানা সংসদীয় আসন ২৪২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল –আশুগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন। নিজ এলাকার মানুষের কাছে তেমন পরিচিতি না থাকায়, সেখানে মনোনয়ন দেয়া হয় উকিল আব্দুস সাত্তারকে। বিএনপির যে ৫ জন সংসদ সদস্য জয়ী হন তার মধ্যে আব্দুস সাত্তার অন্যতম।

একাদশ সংসদের ফলাফল প্রত্যাখান করে বিএনপি ও তাদের জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংসদে যাবেন না এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল । কিন্তু শরিক গণফোরামের দুই সংসদ সদস্য শপথ নেয়ার পর সংকটে পড়ে বিএনপি। নানা সমীকরণের পর দলের মহাসচিবকে বাদ দিয়ে অন্য সদস্যদের শপথ নিতে নির্দেশনা দেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। সে সূত্রে একাদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি একটি নারী আসন বরাদ্ধ পান।
এ আসনে কে বসবেন এ নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত বিএনপি’র অনেক প্রবীন ও অভিজ্ঞ রাজনীতিককে পেছনে ফেলে সেই আসনটি নিজের কব্জায় নিতে সক্ষম হন ব্যারিস্টার রুহিন ফারহানা। কোটায় পাওয়া একমাত্র সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসাবে মনোনয়ন পেয়ে সবার নজর কেড়েছেন তিনি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া তাকে এ আসনটি উপহার দিয়েছেন বলে খোদ দলের মধ্যে ওপেন-–সিক্রেট প্রচার রয়েছে।

এ নিয়ে আলোচনা- সমালোচনা যখন তুঙ্গে তখন (৯ জুন দুপুর ১২ টায়) স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সংসদ ভবনস্থ তার কার্যালয়ে সংসদে ৫০তম নারী হিসাবে শপথ নেন রুমিন ফারহানা। শপথ নেওয়ার পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝড় তুলেন ব্যারিস্টার রুমিন। সংসদে যোগদানের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন এ সংসদ ‘অবৈধ’। বিপত্তিটা এখানেই। শুধু কী তাই তিনি আরো বলেন, ‘এ সংসদের মেয়াদ যেন একদিনের বেশি না হয়! এই সংসদটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। গঠিত হওয়ার পর আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই সংসদকে অবৈধ বলেছি। আমি এখনও তা বলছি’।
এখানে থেমে নেই। এর দুইদিন পর ১১ জুন (মঙ্গলবার) বিএনপির একমাত্র নারী সাংসদ রুমিন ফারহানা প্রথম সংসদ বৈঠকে অংশ নিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। তাঁকে সময় দেওয়া হয় দুই মিনিট। বক্তব্যের শুরুতে রুমিন বলেন, ‘সংসদে আজ আমার প্রথম দিন। যেকোনো রাজনীতিবিদের মতোই সংসদে আসা, সংসদে দেশের কথা, মানুষের কথা বলা আমার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমি এমন একটি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছি যে সংসদটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়।’ তাঁর এ কথার সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি দলের সদস্যরা হইচই শুরু করেন। এর মধ্যেই তিনি বক্তব্য চালিয়ে যান। একপর্যায়ে সময় শেষ হলে রুমিনের মাইক বন্ধ হয়ে যায়। মাইক বন্ধ অবস্থায়ও তাকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। সংসদে প্রথম দিনেই এমন বক্তব্য দিয়ে উত্তাপ দিয়ে নিজেকে কেন নতুন করে উপস্থাপন করতে চাচ্ছেন রুমিন?

তার বক্তব্য যদি সঠিক ধরা হয়, তা হলে রুমিন ওই অবৈধ সংসদে যোগ দিলেন কেন? সংসদ অবৈধ হলে তিনি কী বৈধ? অবৈধ সংসদ থেকে তিনি কী একজন সংসদ সদস্য হিসেবে বেতন-ভাতাসহ নানা ধরণের সুযোগ সুবিধা ভোগ করবেন না? নিশ্চয় করবেন। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, শুধু চমক দেখানো ও তারেক জিয়ার মন জয় করার জন্য তিনি সংসদকে অবৈধ বললেন?

এ সব তীর্যক প্রশ্নের উত্তর চায় জনগণ। একজন গণমাধ্যম কর্মী হিসাবে জানতে ইচ্ছে করে নারী সাংসদ রুমিন কী তার মাসিক বেতন ৫৫ হাজার টাকা, নির্বাচনী এলাকার ভাতা প্রতিমাসে ১২হাজার ৫ শ টাকা, সম্মানী ভাতা প্রতিমাসে ৫হাজার টাকা, মাসিক পরিবহন ভাতা ৭০ হাজার টাকা, নির্বাচনী এলাকায় অফিস খরচের জন্য প্রতিমাসে ১৫হাজার টাকা, প্রতিমাসে লন্ড্রি ভাতা ১ হাজার ৫শত টাকা, প্রতি মাসে ক্রোকারিজ, টয়লেট্রিজ কেনা বাবদ ভাতা ৬হাজার টাকা, দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ খরচ ১ লাখ ২০হাজার টাকা,স্বেচ্ছাধীন তহবিল বার্ষিক ৫ লাখ টাকা, টেলিফোন বিল বাবদ প্রতিমাসে ৭ হাজার ৮শ টাকা। বছরে এলাকার উন্নয়ন বরাদ্দ পাবেন ৪ কোটি টাকা। এছাড়া পাবেন শুল্কমুক্তভাবে গাড়ি আমদানির সুবিধা এবং সংসদ ভবন এলাকায় ফ্ল্যাট না নেয়ার ঘোষণা দিবেন? নিশ্চয় দিবেন না।

রাজনীতিকরা বুদ্ধিমান। সাধারণ জনগণ থেকে বেশি জানেন, বুঝেন। চালাকতো বটেই। তারা যখন-তখন সুবিধা মতো মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখতে বেশী পছন্দ করেন। ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সংসদ সদস্য হওয়ার আগ পর্যন্ত ‘বুদ্ধিমতি’ ও ‘যুক্তিমান’ ছিলেন। কিন্তু যখনি সাংসদ হলেন, সংসদে গেলেন তিনি তখনি ‘চালক’ হয়ে গেলেন! বুদ্ধিমতি ও চালাকের মধ্যে পার্থক্য অনেক। জনগণ ‘অবৈধ সংসদের’ অবৈধ’ সংসদ সদস্য হিসাবে র‌্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে দেখতে চায় না। চায়, জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে। সে যোগ্যতা ও মেধা তার রয়েছে।

সংসদ ‘বৈধ-অবৈধ’ এ প্রেক্ষাপটে শুধু এটুকু বলতে চাই, রাজনীতি বিজ্ঞানের পরিভাষায় বৈধতার দুটো মানদণ্ড রয়েছে, একটি কার্যকারিতা, অন্যটি আইনগত। একাদশ সংসদ নির্বাচন যে পদ্ধতিতে হয়েছে, জনগণের অংশগ্রহণ কতটুকু ছিল বা ছিল না, সেটি নিয়ে বির্তক আছে। কিন্তু সংসদের কার্যকারিতা ও আইনগত বৈধতা শতভাগ রয়েছে। এটি আইনজীবী সাংসদ রুমিন ফারহানারও অজানা নয়। তবুও তিনি জেনে-শুনে সংসদকে ‘অবৈধ’ বলে অবহিত করলেন! সংরক্ষিত আসনে বিএনপির একমাত্র সদস্য হিসাবে তার যোগদানের মধ্য দিয়ে একাদশ সংসদ বৈধতার যে সংকট আক্ষরিক অর্থে ছিল সেটি এখন নেই। অন্তত: কার্যকারিতা ও আইনগত দিক দিয়ে একাদশ সংসদ পুরোপুরি বৈধ এতে কোন সংশয় সন্দেহ নেই।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

আরো সংবাদ