চালাচালি-ঠেলাঠেলির খলনায়ক: অতপর…….


১৬ জুন, ২০১৯ ৯:০৮ : অপরাহ্ণ

।।ইয়াসীন হীরা।।
গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে ২০ দিন আত্মগোপনে ছিলেন সোনাগাজী থানার সাবেক  ওসি মোয়াজ্জেম। দাড়ি-গোঁফ রাখেন। একজন আইনজীবীর মাধ্যমে মামলায় জামিনের আবেদন করেন। গোয়েন্দা নজর এড়িয়ে রোববার (১৬ জুন) সকালে আইনজীবীর চেম্বারে যান। কিন্তু সেখানে বিভিন্ন সংস্থার লোকজন আগে থেকেই সেখানে নজরদারি করছিলেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে বেরিয়ে আসেন মোয়াজ্জেম। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া মামলার আসামি মোয়াজ্জেমের। আদালত চত্বর থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়।

প্রসঙ্গত: গত তিন সপ্তাহ আগে থেকে ওসি মোয়াজ্জেম বিনা নোটিশে কর্মস্থল রংপুর পুলিশ রেঞ্জ থেকে উধাও হন। তাকে গ্রেফতারে পুলিশের বেশ অনীহা ছিল। তার নিখোঁজের আগেই গ্রেফতারি পরোয়ানাও নিখোঁজ হয়ে যায়। নানা সমীকরণ কষে যখন ফেনী পুলিশ সুপার গ্রেফতারি পরোয়ানা পাওয়ার কথা স্বীকার করলেন। পরে বিশেষ বার্তা বাহকের মাধ্যমে পরোয়ানা রংপুর রেঞ্জে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানকার ডিআইজি বললেন, পরোয়ানটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পাঠানো হয়নি। তিনি তা ফেরত পাঠান। এভাবে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারে ঠেলাঠেলি, চালাচালি চলে আসছিল। এ অবস্থায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ঢাকায় এসে আত্মগোপন করেন। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু ঈদের বন্ধ থাকায় অবকাশকালীন বেঞ্চে তার জামিন শুনানী হয়নি। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম পালিয়েছে। তাকে ধরতে সময় লাগবে। শিগগির গ্রেফতার হবেন তিনি।

অন্যদিকে মামলার বাদী নিজেই ফেসবুক লাইভে ঘোষণা দেন ১৬ জুনের মধ্যে আসামিকে গ্রেফতার না করলে তিনি আবারো হাইকোর্টে এর প্রতিকার চাইবেন এবং অভিযুক্ত করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের। সবকিছু মিলিয়ে সেই খল-নায়ক সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করা হলো। তার গ্রেফতারের মধ্যে দিয়ে সাধারণ জনগণ মন্তব্য করেন, হলো ‘পুলিশ চাইলে পারে’। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি বড় অগ্রগতি। এতে সরকার ও পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে।

সোনাগাজির নুসরাত রাফি এর ছবির ফলাফল

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরই যৌননির্যাতন- হয়রানি বিরুদ্ধে। নুসরাতকে যৌন নির্যাতন ও পুড়িয়ে মারার ঘটনায় তিনি শোকাহত, মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। প্রধানমন্ত্রী নুসরাতকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠানোর নির্দেশও দিয়েছিলেন। দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রধানমন্ত্রীর এমন ভালবাসা ও প্রচেষ্টাকে স্বাগত ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটের ডাক্তারদের অক্লান্ত পরিশ্রম- প্রচেষ্টা দেশের মানুষের সহানুভূতি ও ভালবাসাকে পিছনে ফেলে শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া, যন্ত্রণাকাতর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সারাদেশ কেঁদেছে। কিন্তু কাঁদেনি সেই মাদ্রাসা অধ্যক্ষ ও তার পিশাচ বাহিনী। এর মধ্যে ওসি মোয়াজ্জেম অন্যতম। বিপুল অর্থের বিনিময়ে নুসরাতের যৌন হয়রানির বিষয়টি ধামাচাপা ও বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। এমন কী যেদিন নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়া ঘটনাটি তিনি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল! কিন্তু নুসরাতের স্বীকারোক্তি এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও নিরপেক্ষতার কারণে ওসি মোয়াজ্জেম ও অধ্যক্ষ সিরাজের ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়।

শুধু কী তাই, মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি থানায় শ্লীলতাহানির অভিযোগ জানাতে গেলে মোয়াজ্জেম তাঁর ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। ভিডিওতে দেখা যায়, নুসরাতকে বেশ কিছু আপত্তিকর প্রশ্ন করেন তিনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যুর পর ভিডিওটি ব্যাপকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পায়।

নুসরাতের শ্লীলতাহানি ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাটি ওসি মোয়াজ্জেম ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্ঠা চালায়। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তর একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি গত ৩০ এপ্রিল রাতে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতে বলা হয়, ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এম এনামুল করিম, সহসভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীন, স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ স্থানীয় জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যথাযথভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেননি।

উল্লেখ, ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তার মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের নামে নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন ওসি মোয়াজ্জেম। পরে সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেন তিনি। দুর্বৃত্তদের আগুনে নুসরাত অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর ‘ নুসরাতকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ভিডিও করে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে’ ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ১৫ এপ্রিল ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন ২৭ মে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।

ওই দিনই সাইবার ট্রাইব্যুনাল থেকে স্মারক নম্বর ৬৬৯ যোগে ফেনীর পুলিশ সুপারের ঠিকানায় সেটি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিঠির স্মারক নম্বর ৬৬৯। কিন্তু সাত দিনও পরও সেই পরোয়ানাটি কোথায় কার কাছে আছে তার কোন তথ্য নেই ফেনী পুলিশ সুপার এর কাছে। অন্য দিকে রংপুর ডিআইজিও বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম কোথায় আছে, তা তিনি জানেন না!

প্রসঙ্গত: গত ৬ এপ্রিল এইচএসসি সমমানের আলিম আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে গেলে দুর্বৃত্তরা নুসরাত জাহান রাফিকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে গত ১০ এপ্রিল নুসরাত মারা যান।

এর আগে পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী, গত ৮ মে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি রংপুর রেঞ্জ অফিসে যোগ দেন। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন। গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে ফেনী ও রংপুর পুলিশের ঠেলাঠেলি চলছিল। ঈদের আগে সেখান থেকে নিরুদ্দেশ হন ওসি মোয়াজ্জেম। গত ২৯ মে আইনজীবী সালমা সুলতানার মাধ্যমে তিনি হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদনও করেছেন। তবে শুনানি হয়নি। এ অবস্থায় মোয়াজ্জেম হোসেন ঢাকাতেই অবস্থান করতে থাকেন।

কথায় আছে, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। পাপের শাস্তি অবশ্যাম্ভাবী। এই শাস্তি, পার্থিব জীবনে যেমন বলবৎ হয়-তেমনি অপার্থিব জগতেও আরোপিত হয়। এ থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না। ওসি মোয়াজ্জেম হয়ত ক্ষমতার চেয়ারে বসে অনেক পাপ করেছেন। কিন্তু নুসরাতের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পূর্ণতা পেয়েছে! ধন্যবাদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনকে। তিনি ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা না করলে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতেন। কিছুদিন পর হয়ত অন্য কোন থানায় ওসি হয়ে দায়িত্ব পালন করতেন!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরো পড়ুন:

সরিষায় ভূত, না ভূতে সরিষা?

উপহার সাংসদ এবং তার ‘অবৈধ’ সংসদ

 

আরো সংবাদ