বিষয় :

‌‌’তুঘলকি’ তারেক এবং ‌‘দম’ ফখরুল !


২৪ জুন, ২০১৯ ৭:৪৬ : অপরাহ্ণ

।।ইয়াসীন হীরা।।

মুহাম্মদ বিন তুঘলক। আরেক নাম গাজী মালিক। ১৩২১ থেকে ১৩২৫ সাল পর্যন্ত দিল্লী শাসন করেন। তিনি একবার চিন্তা করলেন, দিল্লী থেকে দেবগিরি পাহাড়ের পদদেশে রাজধানী নিয়ে যাবেন। যে চিন্তা, সেই কাজ। রাজমন্ত্রীদের আপত্তি সত্বেও রাজভান্ডার খালি করে নতুন নতুন স্থাপনা করে রাজধানী নিয়ে গেলেন দেবগিরি পাহাড়ের পাদদেশে। নাম দিলেন দৌলতাবাদ প্রকাশ তুঘলকাবাদ। মাত্র ৬ মাসের মধ্যে মুহাম্মদ বিন তুঘলক সিদ্ধান্ত বদল করলেন, এ জঙ্গল-পাহাড় ছেড়ে যাবেন! আবার দিল্লী নিয়ে গেলেন রাজধানী।

শুধু খেয়ালের বশে রাজধানী পরিবর্তনের এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।মাঝখানে রাজভান্ডার শুন্য হয়ে গেল।মাত্র ৪ বছরের শাসনামলে তিনি এমন অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা জনগণের কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি হয়েছিল।

দূর্বল রাজ্যনীতি, অসহিষ্ণুতা, পাগলামী, খামখেয়ালি  এবং রহস্যময় আচরণের কারণে কুখ্যাত ছিলেন মুহাম্মদ বিন তুঘলক।  তাই বাংলা এবং উর্দূতে তুগলকি কাণ্ড বলতে আজব এবং অবান্তর কাণ্ড-কারখানাকে বুঝায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির সাম্প্রতিক কাণ্ড সেই ‌‌’তুঘলকি ‘আমলকে স্বরণ করিয়ে দেয়। একবার সিদ্ধান্ত নিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না। আবার গেলেন।ইভিএম মেনে নিবেন না। এখন মেনে নিলেন (২৪ জুন বগুড়া-৬ ফখরুলের ছেড়ে দেয়া আসনে পুরোটায় ভোট হয়েছে ইভিএম এর মাধ্যমে) ওই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখান করলেন। বিএনপির যে ৫জন  জয়ী হলেন তাদের সংসদে না যাওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন দলের নীতিনির্ধারক স্থায়ী কমিটি। হুঁশিয়ারি দিলেন কেউ সংসদে গেলে তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হবে। কিন্তু ৩০ এপ্রিল শপথ নেয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে বিএনপির ধানের শীর্ষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত ৪জন  শপথ নিতে চলে গেলেন।  প্রথমে ২৫ এপ্রিল গেলেন একজন। তখন বিএনপি থেকে বলা হল, সরকার চাপ প্রয়োগ করে তাকে শপথ নিতে বাধ্য করেছে।তার সদস্যপদ বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করবেন বলেও সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন।এতেও দমানো যায়নি অন্যদের। তিনদিন পর (২৮ এপ্রিল) চলে গেলেন একসঙ্গে তিনজন। ওমনি গণেশ উল্টে গেল! মহাসচিব মির্জা ফখরুল ঘোষণা দিলেন, স্থায়ী কমিটি ও তারেক জিয়ার নির্দেশে ওরা সংসদে গেছে। কিন্তু তিনি গেলেন না।

বিএনপি বলছে, এটি কৌশল! মহাসচিব সংসদে গেলে আন্দোলনের ক্ষতি হবে! স্থবির হয়ে যাবে আন্দোলনের কর্মসূচি।

খোদ বিএনপির ভেতর থেকে প্রশ্ন ওঠেছে, আন্দোলনের জন্য কী নির্বাচিত দলের মহাসচিবকে এমন বিসর্জন? স্থায়ী কমিটির কোন সদস্য নির্বাচিত হননি, তারা কী করবেন? মহাসচিব যদি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার একমাত্র কাণ্ডারি ধরা হয়, তা হলে একাদশ সংসদে দু’টি আসনে মনোনয়ন দেয়া হলো কেন?

ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচিত বিএনপি’র  সংসদে যাওয়া স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর রায় তো বলেই দিলেন, সংসদে যাওয়ার পক্ষে যদি কমিটির সিদ্ধান্ত হয়, তা’হলে ফখরুল ইসলাম গেলেন না কেন? তিনি না গিয়ে তো স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অমান্য করলেন!

বিএনপি’তে কখনো স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে কিছু হয়নি। সব হয়েছে দলের চেয়ারপাসন’র ইচ্ছায়।দলটির গঠনতন্ত্রে চেয়ারপাসনকে এমন ক্ষমতা দেয়া আছে। এখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওরফে তারেক জিয়া। তিনি লন্ডন থেকে ‌‘ওহি’ (বার্তা) প্রেরণ করেন। স্থায়ী কমিটির অনড় সিদ্ধান্তের পরও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক জিয়া সবাইকে সংসদে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। শুধু তাই নয়, কোটায় পাওয়া সংরক্ষিত আসনে একমাত্র মহিলা সদস্যকে সংসদে পাঠালেন। শুধু মির্জা ফখরুল ইসলামকে পাঠালেন না ।

সংসদে গিয়ে বিএনপির চার সংসদ সদস্য নিয়মিত কার্যক্রমে অংশ নেন। পরে কোটায় প্রাপ্ত একমাত্র সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনীত রুহিন ফারহানা শপথ নেয়ার পরপরই তার প্রতিক্রিয়ায় একাদশ সংসদকে অবৈধ বলে অবহিত করলেন। আরো বললেন, জনগণ ভোট দিতে পারেনি। একাদশ জাতীয় সংসদ ভোটে নির্বাচিত নয়। ‘আমি চাই এ সংসদের মেয়াদ একদিনও যেন বৃদ্ধি না হয়’! পরের দিন সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পেলেন তিনি। ওই সময়ও আগের দিনের রেকর্ড বাজালেন।

ব্যারিস্টার এ নারী সাংসদ এর বক্তব্যই সত্য ধরেই নিলাম। তা’ হলে কী দাঁড়ালো?   বিএনপি যে সব সংসদ সদস্য শপথ নিলেন, তারা কী জনগনের ভোটে নির্বাচিত? যদি না হয়ে থাকে, তারা কেন শপথ নিলেন? অবৈধ সংসদ’তো তাদের শপথ নেয়ার পর মধ্য দিয়ে বৈধতা পেয়ে গেল!

বিএনপির সংসদ সদস্যরা  শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা, সংসদ ভবন এলাকায় ফ্ল্যাট, মাসিক বেতন ৫৫ হাজার টাকা, নির্বাচনী এলাকার ভাতা প্রতিমাসে ১২হাজার,৫ শ টাকা, সম্মানী ভাতা প্রতিমাসে ৫হাজার টাকা, মাসিক পরিবহন ভাতা ৭০ হাজার টাকা, নির্বাচনী এলাকায় অফিস খরচের জন্য প্রতিমাসে ১৫হাজার টাকা, প্রতিমাসে লন্ড্রি ভাতা ১ হাজার ৫শ’ টাকা,  প্রতি মাসে ক্রোকারিজ, টয়লেট্রিজ কেনা বাবদ ভাতা ৬হাজার টাকা, দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ খরচ ১ লাখ ২০হাজার টাকা,স্বেচ্ছাধীন তহবিল বার্ষিক ৫ লাখ টাকা, টেলিফোন বিল বাবদ প্রতিমাসে ৭ হাজার ৮শ’ টাকা। বছরে এলাকার উন্নয়ন বরাদ্দ  ৪ কোটি টাকা ছেড়ে দিবেন? নিশ্চয় দিবেন না। প্রশ্নই আসে না।

এদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের শুণ্য ঘোষিত বগুড়া- ৬ আসনের  উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।  নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপিও।  স্থানীয় বিএনপির নেতাকে জয়ী করতে ফখরুলকে বাধ্য করা হল কেন ? এটা কেমন কৌশল? প্রশ্ন ওঠেছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কী বিএনপির তুঘলকি রাজনীতির শিকার, নাকি তারেকের ভুলের খেসারত ‌‘দম’ এর শিকার?

‘দম’। এ শব্দটির ব্যবহার বহুবিধ। এটি কখনো নি:শ্বাস, কখনো সুস্বাদু খাদ্য অবার কখনো ভুলের খেসারত হিসাবে ব্যবহার হয়।  বিশেষ করে যারা হজ্ব পালন করেন তারা এ শব্দটির সঙ্গে বেশি পরিচিত। ইহরাম পরিধান অবস্থায় হজ্বের কোন ‌‌‘ওয়াজিব’ পালনে ব্যর্থ হলে কিংবা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় কোন ভুল করলে পশু জবাই করে তা গরীবদের মধ্য বিতরণ করতে হয়। এটাকে ‌‘দম’ বলা হয়।

মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রয়েছে বর্ণাট্য রাজনীতির ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যায়নকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের  রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের মাধ্যমে জীবন শুরু করেন।  ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যাক্তিগত সচিব হিসেবে  ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।  এরশাদ ক্ষমতায়  আসার পর শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান ফখরুল। তবে এবার  ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে । ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলন চলাকালে ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খাদেমুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। পরের বছর ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন।  ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেন এবং পরাজিত হন।

২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথমে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।  ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির ৫ম জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুলকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে নির্বাচিত হন।  পদটিতে এর আগে তারেক রহমান বহাল ছিলেন। তারেক রহমান এ সম্মেলনে দলের ভাইস চেয়ারম্যানের পদ লাভ করেন।

২০ মার্চ ২০১১ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করার পর দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। প্রায় ছয় বছর ভারপ্রাপ্ত থাকার পর ২০১৬ সালের ১৯  মার্চ দলটির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল মহাসচিব নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন কারাগারেও ছিলেন তিনি।

প্রসঙ্গত: ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম  জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি ও তার জোটের শরিক দলগুলো। তাদের দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিবেন না। কিন্তু ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশ নেয়।

একাদশ  সংসদ  নির্বাচনে  মির্জা  ফখরুল ঠাকুরগাও-২ এবং বগুড়া-৬  সংসদীয় আসন থেকে ধানের শীর্ষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ছিলেন। তার নিজের আসনে হেরে গেলেও বেগম জিয়ার আসনে জয়ী হয়ে সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন! কিন্তু তার স্বপ্ন, স্বপ্নই রয়ে গেল। তারেক জিয়া তাকে শপথ নিতে বারণ করেছেন।ফলে তার আসনটিতে পরবর্তীতে উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জি.এম সিরাজ জয়ী হন। তিনিই ফখরুলের পরিবর্তে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন। এ অবস্থায় জাতীয় সংসদে যেতে হলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে অপেক্ষা করতে হবে আরো ৫ বছর। ইতোমধ্যে বিএনপির সপ্তম জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে ঘোষণা দিয়েছেন ফখরুল। সম্মেলনে কী মহাসচিবের দায়িত্ব পাচ্ছেন তিনি। যদি না পান তাহলে তার ‘আম’ ‘ছালা’ দুটোই যাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক জিয়ার ‌’তুঘলকি’ রাজনীতি ও ভুলের খেসারত ‌‌’দম’ এর শিকার হয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

 

 

আরো সংবাদ