দক্ষিণ চট্টগ্রামের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী


১১ জুলাই, ২০১৯ ১০:০৫ : পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম: টানা  বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, পটিয়া, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালী উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ। এসব উপজেলার সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রাবাহিত হচ্ছে।

সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকায় চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুদিন ধরে সারাদেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার কেওচিয়া, বাজালিয়া, পুরানগড়, ছদাহা, পশ্চিম ঢেমশা, ঢেমশা, নলুয়া, আমিলাইশ, চরতী, সাতকানিয়া পৌর এলাকাসহ আরও বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হযয়েছে।বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সবজি ক্ষেত। ভেসে গেছে মাছের ঘের।ফলে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। সাতকানিয়া সরকারি কলেজ, উপজেলা পরিষদের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে। অন্তত ৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করায় পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

কেওচিয়ার তেমুহনী এলাকার জনসাধারণ চলাচলের একমাত্র সড়কটি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ওই সড়ক দিয়ে এখন নৌকা চলছে। ঢেমশা বড়ুয়াপাড়া সড়কটি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে ওই এলাকার মানুষ।

ছদাহা ইউনিয়নের উকিয়ারকুল এলাকায় হাঙ্গর খালের শ্রোতে বেশ কয়েকটি দোকান ও বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।সাতকানিয়ায় বন্যা কবলিত মানুষদের জন্য উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ১০ মেট্রিক টন চাল ও দুইশ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন। এসব এলাকার শত শত মৎস্য খামারের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ায় চাষিদের বড় ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

লোহাগাড়া :এই উপজেলা পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বান্দরবানের পাদদেশে হওয়ায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি প্রবল ঢলে উপজেলার ডলু, টংকা, হাঙ্গরসহ অন্যান্য খালের পানিতে খাল তীরবর্তী বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে।চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়কের অবস্থা খুবই করুন হয়ে পড়েছে। বড়হাতিয়া,আমিরাবাদ,সুখছড়ি,কলাউজান,পুটিবিলা,আধুনগরসহ উপজেলার বহু প্রামীণ সড়ক পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।আধুনগরে ডলুর ভাঙনে খাল পাড়ে বহু কাঁচা বসতঘরে পানি ঢুকেছে। আমিরাবাদ-সুখছড়ি সড়কের অবস্থাও ভাল না।অপরিকল্পতভাবে বালি উত্তোলন করায় নদী ও খালের গভীরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই অতি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নদী ও খালের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির তীব্র স্রোতে নদী ও খালের পাড় ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত ও জনবসতি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

পটিয়া :
অতি বর্ষণে ও শ্রীমাই খালে পাহাড়ি ঢলে পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের পারিগ্রাম সূত্রধর পাড়ায় ৮টি ঘর বিলীন হয়ে গেছে। বুধবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যায় উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের পারিগ্রাম এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।

কম বেশি বিলীন হয়েছে নেপাল সূত্রধর, অমূল্য সূত্রধর, মিলন সূত্রধর, সুমন সূত্রধর, ভুলু সূত্রধর, দীপক সূত্রধর, সিপক সূত্রধর ও দুলাল সূত্রধরের ঘর। এতে অন্তত দশ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি।জানা গেছে, টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানি শ্রীমাই খাল হয়ে নামতে থাকে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলার কচুয়াই, ছনহরা ও ভাটিখাইন এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন পটিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান।

আনোয়ারা: টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির কারণে আনোয়ারার বরুমচড়া, বারখাইন, হাইলধর, বৈরাগ, চাতরী ও পরৈকোড়া ইউনিয়নের ওষখাইন, কৈখাইন, শিলালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।রায়পুর ও জুঁইদন্ডী ইউনিয়নসহ উপজেলার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। জোয়ারের পানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ভারী বৃষ্টিপাতে দুই উপকূলীয় ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

কর্ণফুলী :
কর্ণফুলীতে ইতোমধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে উপজেলা প্রশাসন। কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ সামশুল তাবরীজ বলেন, চাল ও টিনসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণের মজুদ ও ৮০ জনের জন্য শুকনো খাবারের চাহিদা দেয়া হয়েছে।

বাঁশখালী :

টানা বৃষ্টিতে উপকূলীয় এলাকা সরল, গন্ডামারা, চনুয়া, পুইছড়ি, চাম্বল, কাথারিয়া, বাহারছড়া, পুকুরিয়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ ভয়াবহ বন্যা আতঙ্কে রয়েছে। এতে তলিয়ে গেছে নদী পাড়ের গ্রামসহ রাস্তাঘাট। স্বাভাবিকের চেয়ে ২-৩ ফুট পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তলিয়ে গেছে বিভিন্ন ধরণের ফসলি জমি।

পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদীতে প্রচণ্ড ঢেউ থাকায় আতঙ্কে রয়েছে নদী পাড়ের মানুষ। টানা বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে শঙ্খ নদের সংযোগ জলজদর খালের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে পল্লী বিদ্যুৎ দুই দিন ধরে না থাকায় স্থবির বাঁশখালীর জনজীবন।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, সাধনপুর ও বৈলছড়ি ইউনিয়নে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী ৬০ পরিবারকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পুকুরিয়ার তেচ্ছিপাড়া এলাকায় ছয়টি বাড়ি নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে। অন্যান্য ইউনিয়নে পানি থাকলেও বৃষ্টি কমার সাথে সাথে তা নেমে গেছে। আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কাজ করছি। সম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হবে।

বোয়ালখালী :

টানা বৃষ্টিতে বোয়ালখালীতে পাহাড়ি চাষাবাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাহাড় থেকে পড়া শাক সব্জি, লেবু ও পেয়ারা পানির স্রোত থাকায় ভালজুরি খাল দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে অনেক চারাও। খালের পাশে থাকা একাধিক ঘর বাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে।

ভালজুরি খাল পাড়ের বাসিন্দা তোয়াব আলী জানান, টানা বৃষ্টিতে তাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যারা খেতে খাওয়া মানুষ তাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। আয় রোজগার পুরাপুরি বন্ধ।

শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোকারম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। কয়েকটি ঘর একবারে বিলীন হয়ে গেছে পাহাড়ি ঢলে। তাছাড়া পাহাড়ে পাদদেশে গুচ্ছগ্রাম, আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারীদের নিরাপদে থাকতে নির্দেশ দিয়েছি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করার কাজ চলছে। তাদের সহযোগিতা করা হবে।

চন্দনাইশ :
চন্দনাইশে বেশ কিছু নিম্নাঞ্চল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে। বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে শঙ্খ নদীর পানি।ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার নিম্নাঞ্চলসমূহের বিস্তীর্ণ বর্ষাকালীন সবজির ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। কিছুকিছু এলাকায় আউশ ধানের বীজতলাও তলিয়ে গেছে পানির নিচে। ফলে নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় মৎস্য প্রকল্প ডুবে মাছ ভেসে গিয়ে কয়েক লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।দোহাজারী পৌরসভার উল্লাপাড়া, সরকারপাড়া, চাগাচর, জামিজুরী, ঈদপুকুরিয়া,খানবাড়ি, দিয়াকুল, রায়জোয়ারা, কিল্লাপাড়া, পূর্ব দোহাজারী, লোকমানপাড়া, চাগাচর নতুনপাড়া এলাকায় কয়েকশ পরিবার ইতোমধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।নদীর তীরবর্তী দোহাজারী পৌরসভা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, আমিলাইশ, বৈলতলী, বরমা, বরকল ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে বসবাসরত মানুষ ভয়াবহ বন্যার আতঙ্কে রয়েছেন। এছাড়া উপজেলার নিম্নাঞ্চলের গ্রামীণ সড়কগুলো ডুবে ইতোমধ্যেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

বিএনএ/ এইচ.এম/আর করিম চৌধুরী/এস জি নবী

 

ট্যাগ :

চট্টগ্রাম

আরো সংবাদ