বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : পর্ব ১১


১১ জুলাই, ২০১৯ ১১:০৮ : পূর্বাহ্ণ

‘পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধিত্ব অব্যাহত রাখা অসম্ভব কারণ পাকিস্তান বাংলাদেশে বাঙালিদের উপর  গণহত্যা চালিয়েছে’

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঢাকায় অসংখ্য নিরীহ সাধারণ বাঙালি  নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশকে হত্যা করে। ওই রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগ প্রধান  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

পরিকল্পিত গণহত্যার মুখে সারাদেশে শুরু হয় প্রতিরোধযুদ্ধ। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী। গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। মুক্তিবাহিনীর কাছে পরাজয়ের লজ্জা এড়াতে স্বাধীনতা যুদ্ধকে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ৩ ডিসেম্বর ভারতে বিমান হামলার মাধ্যমে যুদ্ধে লিপ্ত হয় পাক বাহিনী। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে  পর্যদুস্ত ও হতোদ্যম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যুদ্ধ বিরতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর কোন ঘোষনা ছাড়াই  ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান ৯৩,০০০ হাজার সৈন্যসহ যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে।

স্বাধীনতার সেই প্রেক্ষাপট বর্তমান প্রজন্মের কাছে অজানা। নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতেই বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ) বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ দলিলপত্র (১-১৫খন্ড) এর ভিত্তিতে ধারাবাহিক ভাবে প্রচার করছে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ’। আজ প্রকাশিত হলো: পর্ব-১১

শিরোনাম : জনসাধারণের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশ    

নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার জনগণের প্রতি এই নির্দেশগুলি জারি করেছেন।

১. চিকিৎসা ও সেবা শুশ্রষার জন্যে আহত ব্যক্তিদের ডাক্তার বা কবিরাজের কাছে নিয়ে যান

২.মুক্তিসংগ্রামের বিশ্বাসঘাতকদের শাস্তি দিন

৩.আওয়ামী লগের স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে জেনে নিন কী করা উচিত

৪. তরুণরা সকলে ট্রেনিং এর জন্যে নিকটতম মুক্তি ফৌজ দপ্তরে চলে আসুন- সেখানেই তারা নির্দেশ পাবেন

৫.প্রত্যেক গ্রাম প্রধান আশেপাশের গ্রাম বা গ্রামগুলির প্রধানদের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ রক্ষা করে চলুন এবং সমস্ত খবরাখবর সম্বন্ধে পরস্পরকে ওয়াকিবহাল রাখুন।

৬.মুক্ত অঞ্চলগুলির সরকারি কর্মচারীরা আওয়ামী লীগের স্থানীয় সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ নিন।

৭. নদী পরিবহন ব্যবস্থার সমস্ত কমর্চারী বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশ মেনে চলুন ও রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রচারিত নির্দেশ উপেক্ষা করুন। ঢাকায় নদী পরিবহন কমর্চারীরা দখলদার জঙ্গী বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করায় বাংলাদেশ সরকার তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।

৮. নিজের এলাকার মুক্তিফৌজ কমান্ডের  নির্দেশ অনুযায়ী  অসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমস্ত নিয়ম মেনে চলুন।

৯. আপনার এলাকায় সন্দেহভাজন লোক ঘোরাফেরা করছে। তাদের সম্বন্ধে সাবধান থাকুন এবং তেমন কোনও লোকের খোঁজ পেলেই নিকটতম মুক্তিফৌজ কেন্দ্রে খবর দিন।

১৪ এপ্রিল ১৯৭১ সাল 

১. প্রতি শহর/গ্রাম/ মহল্লায় এক একজন অধিনায়ক নির্বাচিত করে সমাজ জীবনে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে,আরও ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে শত্রুর সাথে অসহযোগ প্রতিরোধ সংঘাতের দুর্বার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

২.নিজ নিজ এলাকার খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির চাহিদার হিসাব রাখতে হবে। এবং চাহিদা মেটাবার জন্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়াবার আর সংগ্রহ করবার চেষ্টা করতে হবে

৩. কালোবাজারি মুনাফাখোরি চুরি ডাকাতি ইত্যাদি সমাজ বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। আদেশ অমান্য করলে শাস্তিদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

৪. দৈনন্দিন জীবনে সংযম ও কৃচ্ছতা চালিতে যেতে হবে। সর্বপ্রকার বিলাসিতা ত্যাগকরে জাতির বৃহত্তর কল্যাণে পারস্পরিক মমত্ববোধ ভ্রাতৃত্বের হাতকে দৃঢ়তর করতে হবে। আত্মশক্তির উপর বিশ্বাস রেখে আত্মনির্ভরশীল বলিষ্ঠ সমাজ গড়ে তুলতে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

৫.পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধিত্ব অব্যাহত রাখা অসম্ভব কারণ পাকিস্তান বাংলাদেশে বাঙালিদের উপর  গণহত্যা চালিয়েছেতারা কমবেশি চিহ্নিত। মারাত্মক হলো হলো ঘরের শত্রু।  ধর্মের দোহাই দিয়ে অখণ্ডতার বুলি আওড়িয়ে কালোবাজারি মজুতদারির বেশে শত্রুর চর  সরলপ্রাণ বাঙালির আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। এ ধরনের লোককে চিনে রাখতে হবে। বিশ্বাসঘাতকতার পথ ছেড়ে দিতে বলতে হবে। তবুও যদি শুভবুদ্ধির উদয় না হয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে তাদের নাম ঠিকানা জানিয়ে দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ দেশদ্রোহিতার শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা নেবেন।

৬. গ্রামে গ্রামে রক্ষী বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। মুক্তিবাহিনীর নিকটতম শিক্ষণ শিবিরে রক্ষীবাহিনীর স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রামের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা ছাড়াও এরা প্রয়োজনে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নেবেন।

৭. গ্রাম শহর অথবা মহল্লার নেতারা নিজেদের মধ্যে  নেতা নির্বাচন করে গ্রাম গ্রামান্তরে যোগাযোগ ও পণ্য বিনিময় ব্যবস্থার সুযোগ সুবিধা রক্ষার জন্য প্রচেষ্টা চালাবেন। এর উপরের স্তরের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থাকবে প্রাদেশিক ও  জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের হাতে।

৮. বাংলাদেশের সকল মুক্ত এলাকায় সরকারী আধাসরকারী বেসামরিক কর্মচারীরা  স্তরে স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশে কাজ করবেন। শত্রু কবলিত এলাকায় জনপ্রতিনিধিরাই ব্যক্তিবিশেষে অবস্থানুযায়ী ব্যবস্থা করবেন।

৯. সকল সামরিক আধা সামরিক কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি কর্মচারী অনতিবিলম্বে নিকটতম মুক্তিসেনা শিবিরে যোগ দেবেন এবং কোন অবস্থাতেই শত্রুর সহযোগিতা করবেন না।

১০.যোগাযোগ ব্যবস্থার বিশেষ করে নৌ চলাচল সংস্থার কমর্চারীরা কোন অবস্থাতেই শত্রুর সাথে সহযোগিতা করবেন না। যতদূর সম্ভব যানবাহন নিয়ে মুক্ত এলাকায় চলে আসবেন। ( চলবে)

 

সূত্র   : বাংলাদেশ সরকারের প্রচার দপ্তর, তারিখ : ১৩ এপ্রিল, ১৯৭১

 

সম্পাদনায় : আবির হাসান

আরো সংবাদ