শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০

ব্রেকিং নিউজ

আইএমও : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ


১ মার্চ, ২০২০ ১২:৩৪ : অপরাহ্ণ

Commodore Syed Ariful Islam (TAS), ndc, psc, BN

।।কমডোর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম।।
 (ট্যাজ), এনডিসি, পিএসসি, বিএন

ভূমিকা : বিশ্বব্যাপী সমুদ্র সংক্রান্ত ইস্যুগুলো নিয়ে কথা বলার স্বীকৃত বৈধ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)। জাতিসংঘের নীতিমালার অধীনে এ সংস্থাটি গঠন করা হয়।

১৮৮৯ সালে একটি আন্তর্জাতিক মেরিটাইম কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় ওয়াশিংটন ডিসিতে। এ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র শিপিংয়ের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

যদিও প্রাথমিক অবস্থায় সংস্থাটি গঠনের পরিকল্পনা সঠিক পথে চলছিল না। এর জন্য লেগে যায় দীর্ঘ সময়কাল। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠিত হওয়ার পর বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠিত হয়।

১৯৪৮ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে শিপিং বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার অভিষেক হয়। এরপর কেটে যায় এক দশক। ১৯৫৯ সালে ইন্টার গভর্নমেন্টাল কনসালটেটিভ (আইএমসিও) নামে প্রথমবারের মতো একটি মিটিং হয়। যা পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) নামে আবির্ভূত হয়। এ সংস্থাটির সদর দপ্তর লন্ডনে।

বর্তমানে আইএমওতে ১৭৪ সদস্য রাষ্ট্র ও ৩ সহযোগী সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে। আইএমও এর সাধারণ লক্ষ্য হচ্ছে শিপিং সেক্টরের উন্নয়ন ও কাঠামোতে শৃঙ্খলা আনয়ন, নিরাপদ সামুদ্রিক ব্যবস্থা, পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আইনগত বৈধ বিষয়গুলো দেখভাল করা, টেকনিকেল সহযোগিতা দেয়া, সমুদ্রজনিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জাহাজ চলাচলে দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করা।

আইএমও সদস্যদের একটি সংসদ দ্বারা পরিচালিত হয়। যার নেতৃত্বে থাকেন একজন জেনারেল সেক্রেটারী।

সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের পরিচালিত একটি কাউন্সিল অর্থনৈতিক বিষয়গুলো দেখাশোনা করে। আইএমও ৫টি কমিটির মাধ্যমে পরিচিালিত হয়ে থাকে। এ কমিটিগুলোকে সহযোগিতা করে থাকে প্রযুক্তিগত উপকমিটিগুলো।

বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে আইএমও এর সদস্য লাভ করে। আইএমও’র সদস্যপদ লাভের পর থেকে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে আইএমও প্রণীত বিভিন্ন নিয়ম নীতি চলার।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আইএমও’র প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। আইএমও কাউন্সিলে দায়িত্ব পালন করে এসেছে। এ গবেষণাপত্রের উদ্দেশ্য হলো আইএমও ও বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয়া যারা ভবিষ্যতে বিশ্বে  সামুদ্রিক শিল্পে কাজ করবে।

আইএমও’র গঠন প্রকৃতি

আইএমও’র কর্মকাণ্ড সরাসরি বিশ্বব্যাপী শিপিং ও শিপিং শিল্পের দিকে নিবদ্ধ থাকে। এ সংস্থাটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক জাহাজ শিল্পের বিস্তৃত  অবকাঠামোর  বিস্তার সুশৃঙ্খলভাবে  বজায় রাখা।

যাতে শিপিং সেক্টরের উন্নয়ন ও কাঠামোতে শৃঙ্খলা আনয়ন, নিরাপদ সামুদ্রিক ব্যবস্থা, পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বৈধ বিষয়গুলো দেখভাল করা, টেকনিকেল সহযোগিতা দেয়া, সমুদ্রজনিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জাহাজ চলাচলে দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করা যায়।

আইএমও’র কর্মকাণ্ড ৫টি কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। মূল কমিটিকে সহযোগিতা করে থাকে সহযোগী টেকনিকেল কমিটি।

যে ৫টি মূল কমিটি সেগুলো হলো

# দ্য মেরিটাইম সেফটি কমিটি
# দ্য মেরিন এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন কমিটি
# দ্য লিগ্যাল কমিটি
# দ্য টেকনিকেল কো অপারেশন কমিটি এন্ড
# দ্য ফ্যাসিলিটেশন কমিটি

কতিপয় সাব কমিটি টেকনিকেল কমিটির কর্মকাণ্ডগুলোকে সমর্থন দিয়ে থাকে।

এসেম্বলি, কাউন্সিল ও কমিটির গঠন ও দায়িত্ব

এসেম্বলি বা বিধানসভা : এ সংস্থার সর্বোচ্চ পরিচালনা পর্ষদ। এটি সমস্ত সদস্য দেশ নিয়ে গঠিত। নিয়মিত সেশনে এটি বছরে দু’বার মিলিত হয়। তবে প্রয়োজনে বিশেষ অধিবেশন্ও ডাকা হয়। সমস্ত অনুমোদনকৃত কাজের কর্মসূচির দায়দায়িত্ব, বাজেট ও আর্থিক ব্যবস্থা নির্ধারণ এসেম্বলির ওপর বর্তাবে। এসেম্বলি কাউন্সিলের  নির্বাচনও পরিচালনা করবে।

কাউন্সিল : কাউন্সিল বিধানসভা কর্তৃক নিয়মিত অধিবেশনে দুই বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকে। এটি হচ্ছে আইএমও’র এক্সিকিউটিভ অর্গান বা নির্বাহী অঙ্গ। বিধানসভার অধীনে সমস্ত কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধানের জন্য কাউন্সিল দায়ী থাকবে। আইএমও কনভেনশন কর্তৃক বিধানসভার জন্য সংরক্ষিত সমুদ্র সুরক্ষা ও দূষণ প্রতিরোধ সম্পর্কিত সরকারগুলিকে সুপারিশ করার করার কাজ ব্যতীত।

কাউন্সিলের অন্যান্য কাজগুলো হচ্ছে : 

# সংস্থার বিভিন্ন শাখার সাথে সমন্বয় সাধন
# কর্মসূচি প্রণয়ন, বাজেট এর খসড়া প্রণয়ন করে অধিবেশনে উত্থাপন
# কমিটি ও অন্যান্য শাখার প্রতিবেদন এবং প্রস্তাবনা গ্রহণ এবং যথাযথ মতামত ও সুপারিশসহ তাদের অধিবেশন ও সদস্য দেশগুলোতে জমা প্রদান
#এসেম্বলির অনুমোদন সাপেক্ষে সেক্রেটারী জেনারেল নিয়োগ প্রদান
# বিভিন্ন সংস্থার সাথে চুক্তি ও সম্পর্ক উন্নয়নে অধিবেশনের অনুমোদন সাপেক্ষেকার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ
আইএমএ কাউন্সিলের সংবিধান অনুযায়ী ৪০ জন সদস্য রাষ্ট্র তিনি ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হন।

ক্যাটাগরি এ : এ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ১০টি আসন। বৃহত্তর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সদস্য রাষ্ট্র যারা আন্তর্জাতিক শিপিং সার্ভিসের সাথে যুক্ত তারাই এ ক্যাটাগরিতে প্রতিদ্বন্দিতা করে থাকেন।

ক্যাটাগরি বি : বি ক্যাটাগরিতে রয়েছে ১০টি আসন। আন্তর্জাতিক সমুদ্রব্যাপী বাণিজ্যে যাদের আগ্রহ বেশি তারাই এ বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে থাকেন।

ক্যাটাগরি সি : ২০টি আসন রয়েছে সি ক্যাটাগরিতে। সামুদ্রিক যান বা নেভিগেশনের প্রতি যাদের আগ্রহ বেশি। তারাই এ ক্যাটাগরিতে নির্বাচনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা অর্জন করেন।

যে কোন বিভাগ থেকে সদস্য নির্বাচিত হওয়া ব্যক্তিরা কাউন্সিলে সমান অধিকার ও সুযোগ সুবিধাগুলো ভোগ করে থাকে ।

অন্যান্য কমিটির কাজ

মেরিটাইম সেফটি কমিটি (এমএসসি) : মেরিটাইম সেফটি কমিটি হচ্ছে আইএমও এর শীর্ষ টেকনিকেল বডি। এ কমিটিতে সকল সদস্য রাষ্ট্র বসতে পারেন।মেরিটাইম সেফটি কমিটির কাজ হচ্ছে আইএমওর ক্ষমতার মধ্যে যে কোন বিষয় বিবেচনা করা। যেমন :
# নেভিগেশনে সহায়তা প্রদান
# জাহাজ নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি
# সুরক্ষাজনিত বিষয়ে বিবেচনা করণ
#সংঘর্ষ এড়াতে প্রাক সতর্কতা নীতি
# বিপদজনক কার্গো হ্যান্ড্যালিং
# সামুদ্রিক সুরক্ষা পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয়তা।
#হাইড্রোপিক ইনফরমেশন
#লগ বই ও নেভিগেশনাল রেকর্ডস
# মেরিন ক্যাজুয়েলটি ইনভেস্টিগেশন
# সেলভেজ এবং রেসক্যু
# শিপস এবং পোর্ট সিকিউরিটি
# # জলদস্যুতা এবং অন্যান্য যে কোনও বিষয় সরাসরি সামুদ্রিক সুরক্ষাকে প্রভাবিত করে।

দ্য মেরিন এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন কমিটি (এমইপিসি) : এমইপিসি আইএমও’র রেমিটের অধীনে পরিবেশগত সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ করে। এর মধ্যে রয়েছে,মারপোল চুক্তির আওতায় থাকা জাহাজ থেকে নির্গত ধোঁয়ার দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। এর মধ্যে রয়েছে ব্যালাস্ট ওয়াটার মেনেজমেন্ট, এন্টি ফাউলিং সিস্টেম, শিপ পুনর্ব্যবহার,দূষণের প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া এবং বিশেষ অঞ্চল ও সমুদ্র অঞ্চল চিহ্নিতকরণ।

দ্য লিগ্যাল কমিটি : আইনি কমিটি সংস্থার আওতাধীন যে কোনও আইনি বিষয় মোকাবিলা করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত। উক্ত কমিটি আইএমওর সমস্ত সদস্য দেশ নিয়ে গঠিত। আইনি প্রশ্ন মোকাবেলায় এটি ১৯৬৭ সালে একটি সহায়ক সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আইনি কমিটি আন্তর্জাতিকভাবে আইএমও কর্তৃক যে কোন দায়িত্ব পালনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত।

দ্য টেকনিকেল কোপারেশন কমিটি :   টেকনিকেল কো অপারেশন কমিটি আইএমওর সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রোগ্রাম এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করে। টেকনিকেল কো অপারেশন কমিটি আইএমওর সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করে থাকে। কারণ  আইএমও জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ও টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডাকে সমর্থন করে।

দ্য ফ্যাসিলিটেশন কমিটি (এফএএল) : এ কমিটি বন্দরে  আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ট্রাফিক এর সুযোগ সুবিধাদি যেমন কোন জাহাজ, যাত্রী ও কার্গোর আগমন, অবস্থান ও প্রস্থান নিয়ে কাজ করে থাকে।  কমিটি ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়  একক উইন্ডো ধারণাসহ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের সহজলভ্যতা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার দিকে নজর রাখে। উপরন্তু বন্দর বা অন্যান্য টার্মিনালে প্রবেশের সময় আনুষ্ঠানিকতা হ্রাস করা এবং জাহাজের ডকুমেন্টেশনগুলো সহজীকরণের  দিকেও লক্ষ্য রাখে।

উপ কমিটিগুলো :

সদস্য রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক গঠিত এক গুচ্ছ উপকমিটি মেরিটাইম সেফটি কমিটি (এমএসসি) ও দ্য মেরিন এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন কমিটি (এমইপিসি) কে কাজে সহযোগিতা করে থাকে। পৃথক পৃথক উপকমিটিগুলো হচ্ছে :

# হিউমেন এলিমেন্ট, ট্রেনিং এন্ড ওয়াচ কিপিং (এইচটিডব্লিও) বা মানব উপাদান, প্রশিক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ উপকমিটি
# ইমপ্লিমেনটেশন অব আইএমও ইনস্ট্রুমেন্টস বা আইএমও উপকরণ  বাস্তবায়ন উপকমিটি
# নেভিগেশন, কমিউনিকেশনস এন্ড সার্চ এন্ড রেসক্যু (এনসিএসআর) বা নেভিগেশন যোগাযোগ অনুসন্ধান ও উদ্ধার উপকমিটি
# শিপ ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশন (এসডিসি) বা শিপ ডিজাইন ও নির্মাণ উপকমিটি
# শিপ সিস্টেমস এন্ড ইক্যুইপমেন্ট (এসএসই) উপকমিটি
#ক্যারিজ অব কার্গোস এন্ড কন্টেইনারস(সিসিসি)

আইএমও সচিবালয়

লন্ডন সদর দপ্তরে অবস্থিত আইএমও সচিবালয় একজন জেনারেল সেক্রেটারীসহ ৩০০ আন্তর্জাতিক সদস্য সমন্বয়ে গঠিত। আইএমও’র সমস্ত কর্মকাণ্ড সচিবালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সংস্থার জেনারেল সেক্রেটারী পরিষদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে চার বছরের জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। আইএমওতে কর্মরত অন্যান্য কর্মীরা প্রতিযোগিতামূলক বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মহাসচিব নিয়োগ করেন।

আইএমও সহ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জবাবদিহিতা

আইএমও সামুদ্রিক শিল্প ও শিপিংয়ের ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের জন্য এখন পর্যন্ত ৫০টির বেশি সম্মেলন ও কয়েকশ কোড কার্যকর করেছে। আইএমও কর্তৃক সম্মেলনগুলি কার্যকর হওয়ার পর এটি অনুমোদিত রাষ্ট্রসমূহের দায়িত্ব হয়ে যায় অনুমোদন করা এবং এ সম্মেলনগুলিকে তাদের নিজ নিজ জাতীয় আইনে কার্যকর করা। আইএমও বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা ও পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কনভেনশনগুলি ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করে থাকে। সদস্য দেশগুলো আইএমও’র বার্ষিক ব্যয়গুলো বাজেটের মাধ্যমে নির্বাহ করে থাকে।

যে সব পদ্ধতিতে আইএমও নিয়মাবলী নিরীক্ষণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে তা নিচে দেয়া গেল :

আইএমও মেনডাটরি অডিট স্কীম : আইএমও চুক্তির ধারা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে অডিট  এর  বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যাতে সদস্য দেশগুলো তাদের পরিপূর্ণ  দায়িত্বপালনে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকে।

আইএমও’র আরো বাধ্যবাধকতা রয়েছে,সমুদ্রে জীবনরক্ষার নিরাপত্তা স্কীম প্রকল্প ( সোলাস ১৯৭৪ ও ১৯৮৮ প্রটোকল), সমুদ্রগামী জাহাজগুলো থেকে দূষণ রোধ (মারপোল), মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ, সনদ প্রদান এন্ড সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য নিরাপত্তাবিধান করা (এসটিসিডব্লিও ১৯৭৮), লোড লাইনস (এলএল ৬৬ ও ১৯৮৮ প্রটোকল), টনের হিসেবে জাহাজের ওপর ধার্যকৃত শুল্ক পরিমাপ (টনেজ ১৯৬৯), সমুদ্রে নৌ দুর্ঘটনা রোধে নীতিমালা (সিওএলআরওজি ১৯৭২)।

এ স্কীমের অংশ হিসেবে প্রকল্পের নীতিমালার জন্য উপযুক্ত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আইএমও নীতিমালাতে একটি সদস্য দেশ পার্টি হলেও তার জন্য একই আইন প্রয়োগ করা হবে।

একটি সদস্য দেশ আইনগত ও বৈধভাবে নীতিমালা অনুসরণ করলে সে সব সদস্য দেশকে স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ যারা নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ের সাথে জড়িত কর্তৃক সনদ প্রদান করা হয়ে থাকে।

এ সমস্ত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং করবে কর্তৃপক্ষ স্বীকৃত একটি কমিটি। সদস্যদেশগুলোর অনুরোধে আইএমও গঠিত একটি অডিট দল সমস্ত সুযোগ সুবিধাগুলো সংস্থার নীতিমালার আলোকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করবে।

কোন সদস্য রাষ্ট্রের নিরীক্ষণের পর অডিট রিপোর্ট আইএমও’র বার্ষিক রিপোর্টে সাবমিট করা হয়ে থাকে। তার আলোকে সদস্য রাষ্ট্রগুলো কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে তা নেন।

পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল (পিএসসি) : কোন বিদেশি জাহাজ কোন দেশের বন্দরে প্রবেশ করলে তা নিয়ন্ত্রণ করবে দেশটির সরকার। জাহাজের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, সরঞ্জামগুলো আন্তর্জাতিক বিধিগুলোর প্রয়োজনীয়তা মেনে চলছে কিনা দেখা যাতে বিধি ও নিয়ম মেনে জাহাজগুলি পরিচালিত হয়। যাতে বিশ^ব্যাপী শিপিং শিল্পে জাহাজ চলাচল নিরাপদ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এ ব্যাপারে ৯টি আঞ্চলিক চুক্তি রয়েছে।

যা সমঝোতা স্মারক নামে অভিহিত করা হয়। সেগুলো হলো, ইউরোপ ও নর্থ আটলান্টিক (প্যারিস এম্ওইউ), এশিয়া ও প্যাসিফিক (টোকিও এমওইউ),লাতিন আমেরিকা (আকোয়ার্দো ডি ভিনা ডেল মার), ক্যারিবিয়ান (ক্যারিবিয়ান এমওইউ),্ওয়েস্ট এন্ড সেন্ট্রাল আফ্রিকা (আবুজা এম্ওইউ), দ্য ব্ল্যাক সী রিজয়ন (ব্ল্যাক সী এমওইউ), দ্য মেডিটেরিনিয়ন(মেডিটেরিনিয়ন এমওইউ),দ্য ইন্ডিয়ান ওশ্যান রিজিয়ন(দ্য ইন্ডিয়ান ওশ্যান এমওইউ) ও রিয়াদ এমওইউ। যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড ১০ম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ভারত মহাসাগর অঞ্চলের (ইন্ডিয়ান  ওশ্যান এমওইউ) অন্তর্ভুক্ত। ভারতের গোয়ায় ভারত মহাসাগর অঞ্চলের আঞ্চলিক সদর দপ্তর। বাংলাদেশ পরিচালিত সমস্ত বন্দর স্টেট কন্ট্রোলের জন্য গোয়াকে রিপোর্ট করে।

আইএমও’র সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ আইএমও’র সদস্যভুক্ত একটি সক্রিয় দেশ। আইএমও’র অধিকাংশ প্রধান সম্মেলনে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক শিপিং সেক্টরে নিরাপদ নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের নীতি মালা মেনে চলে আসছে।

সুষ্ঠু কার্যকর সর্বজনীনভাবে বাস্তবায়িত শিপিং শিল্পের জন্য একটি নিয়ামক কাঠামো তৈরি করতে আইএমওর ভূমিকাকে বাংলাদেশ সরকার গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আইএমও গাউডলাইন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ সমুদ্রে জীবন রক্ষার নিরাপদ ব্যবস্থা,নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে।

অদ্যবধি সরকার সমুদ্রে জীবন রক্ষা (এসওএলএএস) বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনসহ আইএম্ও’র ২৭ টি সম্মেলনকে অনুমোদন দিয়েছে, আন্তর্জাতিক জাহাজ ও পোর্ট ফ্যাসিলিটি সিকিউরিটি কোড জাহাজের লং রেঞ্জ আইডেন্টিফিকেশন এন্ড ট্র্যাকিং ব্যবস্থা কার্যকর করেছে।

আরো কার্যকর করেছে, ন্যাশনাল রুলস অন স্ট্যান্ডার্ড অব ট্রেইনিং, সার্টিপিকেশনস ওয়াচ কিপিং ফর সী ফেরারার্স, ম্যানিলা এমেন্ডমেন্ট-২০১০ অন এসটিসি ডব্লিও-২০১০।

২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে আইএমও ও বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এরপর থেকে বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিঙ সেক্টরে প্রভূত উন্নয়ন হয়।

কমপ্লায়িং উইথ মেরিটাইম নেভিগেশন এন্ড সেফটি : আইএমও’র প্রয়োজনীয়তা অনুয়ায়ী বাংলাদেশ উপকূলে নৌ পরিবহন সহায়তা বজায় রেখেছে। এ অঞ্চলে অনুসন্ধান ও উদ্ধার সমন্বয়কারী হিসেবেও দেশটি দায়িত্ব পালন করে থাকে।

উপকূলে সামগ্রিক নেভিগেশনাল সুবিধাদি উন্নত করতে ও আইএম্ও নির্দেশিকা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ অনুসন্ধান ও উদ্ধার প্রক্রিয়ার জন্য ২৪/৭ অপারেশনাল কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল সেন্টার সহ গ্লোবাল মেরিটাইম ইন্টিগ্রেটেড নেভিগেশন সিস্টেম স্থাপনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এশিয়ায় জাহাজে জলদস্যুতা রোধে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তির সদস্যপদ অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে জলদস্যুতা ও সশস্ত্র ডাকাতির বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছে।

আইএমও কাউন্সিলে বাংলাদেশ  

১৯৭৬ সালে আইএম্ও’র সদস্য পদ লাভের পর বাংলাদেশ কাউন্সিল সদস্য হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। এর প্রেক্ষিতে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত আইএমএ কাউন্সলে ক্যাটাগরি সি তে নিজের অবস্থান ধরে রাখে। পরবর্তীকালে ২০০১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কাউন্সিলের বি ক্যাটাগরিতে ওঠে এসে বাংলাদেশ বৈশ্বিক  সামুদ্রিক সংস্থার লক্ষ্য এবং লক্ষ্যগুলির প্রতি দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতি বজায় রাখে।

কাউন্সিলের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ২০০০-২০০৪ সালের মধ্যে কারিগরি সহযোগিতা কমিটির সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করে। এছাড়া বিভিন্ন্ ওয়ার্কিং গ্রুপ, ড্রাফটিং গ্রুপ, করেসপনডেন্ট গ্রুপ এর সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছে।

এ ছাড়া ছিল ডেভলপমেন্ট অব এসেম্বলি রেজ্যুলেশন ও শিপ রিসাইক্লিং গাইডলাইন, রিভিশন অব দ্য ফিশিং ভেসেলস সেফটি কোড এন্ড ভলান্টিয়ার গাইডলাইনস, ফলো আপ দ্য ১৯৯৫ এসটিসিড ব্লিও কনফারেন্স, টেইনিং অব মেরিটাইম পাইলটস প্রভৃতি দায়িত্বপূর্ণ কাজ।

২০১৫ সালে  এক   বাংলাদেশি  আন্তর্জাতিক মোবাইল স্যাটেলাইট অর্গানাইজেশন(আইএমএসও) এর ডাইরেক্টর জেনারেলের পদ অলংকৃত করে। ২০১৯ সালে আবারো একই পদে দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। বাংলাদেশ শিপিং কর্মকর্তারা নিয়মিভাবে আইএমও এসেম্বলি কাউন্সিল কমিটি ও সাব কমিটিতে অংশগ্রহণ করে আসছে।

উপসংহার

বিশ্বব্যাপী আইএমও নিরাপদ সুরক্ষিত এবং পরিবেশ বান্ধব শিপিং নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ দায়িত্বগুলি নিশ্চিত করতে আইএমও বিভিন্ন কনভেনশন, প্রটোকল, আইনি সুরক্ষা ও বিধিবদ্ধ আইনি নীতিমালা প্রেরণ করে।

বাংলাদেশ  সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে আইএমও’র  নীতিমালাগুলোকে অনুমোদন দিয়েছে।  মূলতে এ সব নীতিমালা  সমুদ্র ও নৌপরিবহন  শিল্পকে প্রভাবিত করে এবং এ শিল্পগুলিতেও এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

এ অবধি বাংলাদেশ ২৭টির মতো আইএমও কনভেনশন অনুমোদন করেছে। অনুমোদনের জন্য বেশ কয়েকটি কনভেনশন রয়েছে। বাংলাদেশ আইএমও বিষয়গুলোতে সক্রিয়ভাবে জড়িত এবং আইন প্রণালীতে কার্যকরভাবে অবদান রাখে। আইএমও সদস্য হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থারও সদস্য।

রিক্যাপ, ভারত মহাসাগর সমঝোতা স্মারক ইত্যাদি যা আইএমও বিধি ও বিধিবিধানের সম্মতি সমন্বিত প্রয়োগ বা নিরীক্ষণ করে। বাংলাদেশ সমুদ্র শিল্প ও শিপিংয়ে আইএমও নিয়মকানুন প্রয়োগের একটি ভাল ট্র্যাক রেকর্ড বজায় রেখেছে।

বাংলাদেশের সামুদ্রিক আইন এখন বিশেষজ্ঞরা পর্যালোচনা করছেন। এটি বাংলাদেশের জাতীয় সামুদ্রিক আইনে আইএমও সম্মেলন বিধিবিধানকে কার্যকর করবে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আইএমও কাউন্সিলে থেকে সংস্থার কার্যক্রমে অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশ সম্প্রতি আইএমও’র বাধ্যতামূলক নিরীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করেছে এবং নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুসারে একটি কমপ্লায়েন্ট সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। আশা করা যায়, আগামী দিনেও বাংলাদেশ আইএমওর সাথে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।

লেখক : ডিরেক্টর জেনারেল, ডিপার্টমেন্ট অব শিপিং, বাংলাদেশ

মূল ইংলিশ আর্টিকেলটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন : INTERNATIONAL MARITIME ORGANIZATION (IMO) AND BANGLADESH

Print Friendly and PDF

আরো সংবাদ

আর্কাইভ
May 2020
F S S M T W T
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30