শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০

ব্রেকিং নিউজ

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পর্ব : ১৪৩


২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ৯:০০ : পূর্বাহ্ণ

“তোম পাকিস্তান কা দুশমন হ্যায়”


আজ প্রকাশিত হলো পর্ব : ১৪৩

এ সময় একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেল। আমি একদিন মিয়া সাহেবের সাথে দেখা করতে পাকিস্তান টাইমসের অফিসে যাই। তখন প্রায় সকাল এগারটা। মিয়া সাহেব সেখানে নাই। আমি কিছু সময় দেরি করলাম। মিয়া সাহেব আসলেন না। আমার কাজ ছিল শহীদ সাহেবের সাথে। হাইকোর্টে যাব তাঁর সাথে দেখা করতে। যখন আমি বের হয়ে কিছুদূর এসেছি, তিন চারজন লোক আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, আমার বাড়ি কোথায়? আমি বললাম, “পূর্ব পাকিস্তানে।” হঠাৎ একজন আমার হাত, আর একজন আমার জামা ধরে বলল, “তোম পাকিস্তান কা দুশমন হ্যায়”। আরেকজন একটা হান্টার, অন্যজন একটা ছোরা বের করল। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, “আপনারা আমাকে জানেন, আমি কে?”  তারা বলল, “হ্যাঁ, জনতা হ্যায়।” আমি বললাম, “কথা শোনেন, কি হয়েছে বলুন, আর যদি লড়তে হয় তবে একজন করে আসুন।” একজন আমাকে ঘুষি মারল, আমি হাত দিয়ে ঘুষিটা ফিরালাম।

অনেক লোক জমা হয়ে আছে। কয়েকজন ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে? আমি বললাম, “কিছুই তো জানি না। এদের কাউকেও চিনিও না। আমি পূর্ব বাংলা থেকে এসেছি। পাকিস্তান টাইমস অফিসে এসেছিলাম মিয়া সাহেবের সাথে দেখা করতে। এরা কেন আমাকে মারতে চায়, বুঝতে পারলাম না।” কয়েকজন ভদ্রলোক ও কয়েকজন ছাত্রও ছিল। তারা ওদের কি যেন বলল, আর একজন ওদের ওপর রাগ দেখাল, ওরা সরে পড়ল। আমি ল’কলেজ হোস্টেলে গেলাম, কাজমীকে খবর দিতে। কাজমী ছিল না হোস্টেলে। একটা টাঙ্গা নিয়ে হাইকোর্টে আসলাম সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে।

কিছুই খেলাম না, ভীষণ রাগ হয়েছে। বিকালে তাঁর সাথে নবাব সাহেবের বাড়িতে যেয়ে সকল ঘটনা বললাম। শহীদ সাহেব নবাব সাহেবকে জানালেন। সন্ধ্যার পূর্বেই হোটেলে চলে এলাম। কাজমী সন্ধ্যার পরে হোটেলে এসে সবকিছু শুনে নিজেই সেই জায়গায় চলে গেল কয়েকজন ছাত্র নিয়ে এবং দোকানদারদের কাছে জিজ্ঞাসা করল। তারা বলেছিল যে, যারা আমাকে আক্রমণ করেছিল তারা ঐ জায়গায় কেউ নয়। বাইরের কোথাও থেকে এসেছিল। বোঝা গেল মুসলিম লীগ ওয়ালাদের কাজ। এখানেও গুণ্ডা লেলিয়ে দিয়েছে। লুন্দখোর আমাকে বলল, “সাবধানে থেকো।”

আরো পড়ুন: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্ব : ২০০

আমি এই ঘটনা আর কাউকে বললাম না। নবাব সাহেবকে পাঞ্জাবের বড় বড় সরকারি কর্মচারীরা সম্মান করত। আমার উপর আক্রমণের কথাটা সেখানেও পৌঁছে ছিল। আমার অসুবিধা ছিল ভাল উর্দু বলতে পারতাম না। আর সাধারণ পাঞ্জাবিরাও ভাল উর্দু বলতে পারে না। পাঞ্জাবি ও উর্দু মিলিয়ে একটা খিচুড়ি বলে। যেমন আমি বাংলা ও উর্দু মিলিয়ে খিচুড়ি বলতাম। এই সময় পাঞ্জাবে প্রগতিশীল লেখকদের একটা কনফারেন্স হয়। মিয়া সাহেব আমাকে যোগদান করতে অনুরোধ করলেন। আমি যোগদার করলাম।

লেখক আমি নই, একজন অতিথি হিসাবে যোগদান করলাম। কনফারেন্স দুই দিন চলল। লুন্দখোর সাহেবও যোগদান করেছিলেন, বেচারার গাড়িটি বাইরে রেখে সভায় যোগদান করেছিলেন; কে বা কারা গাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। লুন্দখোর সাহেবের বাহনটাও নষ্ট হয়ে গেল। ইংরেজরা ১৯৪২ সালের আন্দোলনে তাঁর বাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ, তখন তিনি সীমান্ত কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। জেল থেকে বের হয়ে মুসলিম লীগে যোগদান করেছিলেন। লুন্দখোর আমাকে বললেন, “লাহোরে এ সকল ঘটনা হয়ে থাকে, তবে আমি পাঠান, আমাকে এরা ভয় করে। সামনে কিছুই বলতে বা করতে সাহস পাবে না, তাই পিছন থেকে আঘাত করার চেষ্টা করছে।”

পরিকল্পনা : ইয়াসীন হীরা

গ্রন্থনা : সৈয়দ গোলাম নবী

সম্পাদনায় : মনির ফয়সাল /আবির হাসান 

আগের পর্ব পড়ুন : বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পর্ব : ১৪২

Print Friendly and PDF

আরো সংবাদ

আর্কাইভ
May 2020
F S S M T W T
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30