শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০

ব্রেকিং নিউজ

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম সুলতান আহমদের আজ ২৪তম মৃত্যু বার্ষিকী


১৭ মে, ২০২০ ৪:২১ : অপরাহ্ণ

।।সৈয়দ গোলাম নবী।।

নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, খাদ্য সরবরাহ  বাড়ি ও বাড়ির আঙ্গিনায় পাকহানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধকল্পে গোপন মিনি ক্যান্টনমেন্ট বানিয়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে উদারভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন সুলতান আহমদ। এ জন্য তার বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে চরম প্রতিশোধ নেয় পাক হানাদার বাহিনী।

রনাঙ্গনে স্টেনগান হাতে না নিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও রসদ সরবরাহের অপরাধে সুলতান আহমদ পড়ে যান পাকবাহিনীর টার্গেটে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ,দানবীর,সজ্জন এবং বন্ধুবৎসল সুলতান আহমদ ১৯২১ সালে ছাগলনাইয়া উপজেলার উত্তর যশপুর গ্রামের(প্রকাশ হাজী বাড়ি)বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন আলহাজ্ব আবদুল হামিদ এবং মাতা হলেন জমিলা খাতুন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর সুলতান আহমদ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এন্ট্রান্স পাশ করলে পিতামহের ইচ্ছায় ব্যবসাবাণিজ্য ও সামাজিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।

পাকিস্তান পূর্ব সময়ে ক্রিসেন্ট ট্রেডিং এবং পাক আমলে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সিলোনিয়া ট্রেডার্স নামে রাজধানীর চকবাজারে সফলতার সাথে ব্যবসা করেন।এগুলো  তৎসময়ে পূর্বপাকিস্তানের নামকরা প্রতিষ্ঠান ছিল। টায়ার টিউব ও ব্যাটারি এবং অন্যান্য সৌখিন পণ্যের আমদানীর জন্য প্রতিষ্ঠানদ্বয় সুপরিচিত হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময় চকবাজারের সিলোনিয়া ট্রেডার্স এর কার্যালয় এবং গুদাম পুড়িয়ে দেয় বিহারীরা।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সুলতান আহমদ বৃহত্তর ছাগলনাইয়া থানা(বর্তমান ফুলগাজিসহ) আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন।রাজধানীর বিহারীদের কাছেও এ তথ্য ছিল।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হলে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা তার  বাড়িতে আশ্রয় নিলে মরহুম সুলতান আহমদ সাহসিকতার সাথে তাদের নিরাপদে থাকার ও আহারের ব্যবস্থা নেন। বাড়ির চারপাশ ও পুকুর পাড়ে ২৯টি  গোপন বাঙ্কার খনন করে সেখানে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করেন।

মুক্তিযোদ্ধারা সুলতান আহমদের বাড়িতে থাকাকালীন সময়ে ছাগলনাইয়া থেকে বিলোনিয়া পর্যন্ত এলাকা দখল নিয়ে  মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকবাহিনীর সাথে ২বার সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। ২বারই তারা পরাজিত হয়ে পিছু হটে।

পরবর্তীতে অবশ্য সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় চট্টগ্রামের ক্যাপ্টেন(পরবর্তীতে কর্ণেল, মন্ত্রী) অলি আহমদের(বীর বিক্রম) নির্দেশে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয় এবং ওই সব মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্তের ওপারে আশ্রয় দেয়া হয় । মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত  ছাগলনাইয়ার মুক্তিযোদ্ধরা সেখানে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যান।

 

সুলতান আহমদের বাড়ি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প প্রত্যাহারের পর রাজাকার ও পাক সেনা সদস্যরা গান পাউডার দিয়ে সুলতান আহমদের বাড়িতে আগুন দেয়। এতে পুড়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক স্মৃতি,দলিল পত্র এবং বাড়ির সমস্ত আসবাবপত্র।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন সুলতান আহমদ।শত বিপদের মধ্যেও তিনি দেশ স্বাধীনের স্বপ্নকে বিসর্জন দেননি।তাই পাক সেনাবাহিনী ও রাজাকাররা গান পাউডার দিয়ে তার বাড়িঘর পুড়িয়ে দিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা বন্ধ করেননি। বরং দ্বিগুন উৎসাহে দেশ স্বাধীন করে রাজাকার ও পাকবাহিনীকে পরাস্ত করতে উঠে পড়ে লাগেন। দেশের ভিতরে ও বিলোনিয়া সীমান্তের ওপারে স্থাপন করা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে রসদ সরবরাহ বাড়িয়ে দেন।

তিনি বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার জুরি বোর্ড মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি সমাজে শিক্ষা  বিস্তারে সবসময় সচেষ্ট ছিলেন।হোক তা ইংরেজি মাধ্যম বা আরবী শিক্ষা ব্যবস্থা। তিনি একাধারে স্কুল,কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্টায় ও পরিচালনায় আজীবন সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন।

তিনি দীর্ঘ সময় ছাগলনাইয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি নিজস্ব উদ্যেগে এলাকার অসংখ্য রাস্তাঘাট নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারের কাজ করেছেন। তিনি তৌহিদী ক্লাব নামে একটি সামাজিক ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে নিয়মিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মিলাদ ও ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করতেন।

 

সুলতান আহমদ ১৯৪৮ সালে একই থানার বাতানিয়ার অপর শিক্ষাবিদ আলহাজ মাস্টার সিরাজুদ্দিনের কন্যা আলহাজ্ব নুরুন্নেসার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শ্বশুর মরহুম সিরাজুদ্দিনও এলাকায় অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ৩৮ বছর টানা মেম্বার ও চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে

সুলতান আহমদ ৭ পুত্র এবং ৪ কন্যা সন্তানের জনক।যারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠত।

 

প্রত্যহ নিয়মিত নামাজ আদায়,ফজরের নামাজ আদায় শেষে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। অন্যদের ব্যবসা বাণিজ্যে আর রাজনীতির পাশাপাশি নিয়মিত এবাদত করার পরামর্শ দিতেন।

এ দেশপ্রেমিক পুরুষ ১৯৯৬ সালের ১৭ই মে ইন্তেকাল করেন।মহান আল্লাহতায়ালা তাকে বেহেস্ত নসিব করুন। আমিন।

Print Friendly and PDF

আরো সংবাদ

আর্কাইভ
May 2020
F S S M T W T
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30