সোমবার, ২৫ মে ২০২০

ব্রেকিং নিউজ

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-০১


৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১১:০৯ : পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার ‘কাগতিয়া আলীয়া গাউছুল আজম দরবার শরীফ’। এ দরবারকে ঘিরে গঠিত হয়েছে ‘‌মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’। দু’টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ সৈয়দ তফজ্জল আহমদ। তিনি পবিত্র কুরআন ও হাদীস বিষয়ে  বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এলাকার মানুষকে নামায কায়েম, রোজা, হজ্ব পালন ও জাকাত প্রদানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার আহ্বান জানাতেন। ধর্ম নিয়ে কোন ধরনের গোঁড়ামি, অলৌকিক ক্ষমতার জাহির, প্রচার কোনটাই করেননি। তার তিন সন্তান থাকলেও বড় দুই সন্তানকে দরবার থেকে বিতাড়িত করেন কনিষ্ঠপুত্র মুনিরউল্লাহ আহমদী। শায়খ তফজ্জল আহমদ শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে তিনি নানা বির্তকিত মনগড়া অলৌকিক কেরামত প্রচার করতে থাকেন। সফলও হয়েছেন। এখন মুনিরউল্লাহ আহমদী স্বনামে-বেনামে শতকোটি টাকার মালিক! কী ছিল মুনিরীয়ার দর্শন? কে, কখন, কোথায়, কীভাবে, কাদের কাছে অলৌকিক কেরামত প্রচার করতেন মুনিরউল্লাহ আহমদী এবং তার সহযোগীরা? তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি(বিএনএ)।অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে কথিত‘‌‌মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’তথা মুনিরউল্লাহ এর ভণ্ডামির নানা তথ্য। বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি(বিএনএ)’র হেড অব নিউজ ইয়াসীন হীরা’র অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।

  

 শায়খ সৈয়দ তফজ্জল আহমদ। পিতা শায়খ সৈয়দ ক্বাজী নূর আহমদ। জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৩ সালে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলা, কাগতিয়া গ্রাম, মাইজপাড়ার সৈয়দ বাড়িতে।তিনি চট্টগ্রামের দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা থেকে ১৯৪৫ সালে আলিম, ১৯৪৭ সালে ফাযিল এবং ১৯৪৯ সালে কামিল তথা ‘মমতাজুল মুহাদ্দেসিন’পাশ করেন।

তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সৈয়দ তফাজ্জল আহমদ মুনিরী সাহেবের জন্ম কোনভাবেই কাগতিয়া নয়, এমনকি উনার বাবার নাম নুর আহমদও নহে।সৈয়দ তফাজ্জল আহমদের জন্ম হাটহাজারীর মাদার্শাতে, উনার নানার বাড়ি হাটহাজারী মেখল ইউনিয়নে, নুর আহমেদের দ্বিতীয় ঘরের সন্তান সৈয়দ তফাজ্জল আহমদ, এমনকি সৈয়দ তফাজ্জল আহমদের মা এবং এক ভাইয়ের কবর হাটহাজারীর মেখলে রয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত অলীয়ে কামেল, শায়খুত তরিক্বত হযরত হামেদ হাছান আলভী আজমগড়ী (র:) এর অন্যতম খলীফা ছিলেন হযরত শায়খ সৈয়দ হাফেজ মুনির উদ্দীন (রা.)। তার মাধ্যমে ইলমে তরিক্বত শুরু করেন। তাঁর শ্বশুর ছিল মাওলানা রুহুল আমীন। যিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ বোগদাদীর বিশিষ্ট খলিফা ছিলেন। অপর দিকে স্ত্রীর মুর্শিদ হলেন মরহুম মাওলানা মুনির উদ্দিন নুরুল্লাহ। যাঁর অন্যতম খলিফা ছিলেন মুনিরীয়া দরবারের পীর কথিত গাউছুল আজম তফজ্জল আহমদ। ১৯৫৪ সালে তরিক্বতের খেলাফত লাভ করেন। যোগদান করেন কাগতিয়া কামিল মাদরাসায় আরবী বিষয়ের প্রভাষক পদে। পরে অধ্যক্ষ হন।

১৯৮৩ সালে রাসূল (স:) এর ‘হিলফুল ফুযুল’-এর অনুসরণে শায়খ তফজ্জল আহমদ গঠন করেন অরাজনৈতিক তরিক্বতভিত্তিক আধ্যাত্মিক সংগঠন ‘মুনিরীয়া তবলীগ ও যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’। এ কমিটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশের মাধ্যমে বিপদগামী যুব সমাজকে ছিরাতুল মোস্তাকিমের দিকে ধাবিত করে আকায়েদে আহলে সুন্নাত এবং আ’মালে সালেহার উপর অটল রাখা, যুব সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে পরিত্রাণ দেয়া, আমর বিল মারুফ তথা সৎ কাজের আদেশ এবং নাহি আনিল মুনকার তথা অসৎ কাজ থেকে বারণ করা, অশ্লীল ও বেহায়াপনা থেকে সমাজকে রক্ষা করা এবং প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ সুনিশ্চিত করা।

এলাকার প্রবীণ লোকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুনিরীয়াদের পীর শায়খ তফজ্জল আহমদ ইসলামিক জ্ঞানে অভিজ্ঞ অত্যন্ত সহজ সরল ও উদার প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি যা বলতেন এলাকাবাসী তাই করতেন। এলাকার লোকজনের কাছে তিনি একজন বিশ্বাসী, ঈমানদার হিসাবে পরিচিত ছিলেন।লোকজন তাঁকে ‘কাগতিয়ার বড় হুজুর’ বলে ডাকতেন।

কাগতিয়া দরবার

কাগতিয়া দরবারের ছবি

অনুসন্ধানে জানা যায়, শায়খ তফজ্জল আহমদ মুনিরী চিন্তা-চেতনায় ছিলেন আধুনিক। তার এবং রেজভি (কাদেরিয়া) আকিদার সুন্নীরা এক ও অভিন্ন মতাদর্শী ছিল। কিন্তু ১৯৮১ সালে আজানে মাইক ব্যবহারকে হারাম ঘোষণা দেয় রেজভি সুন্নীরা। অন্যদিকে শায়খ তফজ্জল আহমদ মুনিরী রেজভিদের বিরোধীতা করে। তারা যুক্তি দিয়ে ঝুঝানোর চেষ্টা করে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের আবিস্কারের কোন সংঘাত নেই। মাইকে আজান দেয়ার মাধ্যমে বেশী মানুষকে নামাজ কায়েম করার আহবান করা যায়। কিন্তু রেজভিরা মাইকে আজান দেয়াকে হারাম ঘোষণায় অটল থাকে।তাদের যুক্তি হচ্ছে, বিদ্যুৎ এর মাধ্যমে চলে মাইক। এ বিদ্যুৎই হচ্ছে আগুন। মাইকে আজান দেওয়া মাহফিল করার মাধ্যমে কোরআনকে প্রকারন্তে জ্বালিয়ে ফেলা হচ্ছে। মাইকে আজান দেয়া হারাম-জায়েজ নিয়ে পরস্পর বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ নিয়ে কয়েক দফা রক্তক্ষয়ী  সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।সাধারণ মুসলমানরা রেজভিদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। সমর্থন দেয় মুনিরীয়াকে। পিছু হটে যায় রেজভিরা। শক্ত অবস্থানে চলে যায় মুনিরিয়ারা।এ পর্যায়ে দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ বি এম বাহাউদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতা পায় মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি। প্রচারও প্রসার বাড়তে থাকে। বিশেষ করে তখন থেকে রাউজান এলাকা পুরোদস্তুর রেজভিদের হাতছাড়া হয়ে যায়। তাদের এ সংঘাতকে কাদেরিয়া বনাম মুনিরীয়া সংঘাত নামে অভিহিত করা হয়।

২০০৩ সাল পর্যন্ত একটি আদর্শ নিয়ে মুনিরীয়া অনুসারিরা একটি আদর্শ ও ন্যায়নীতির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হতো। ওই বছর সর্বশেষ ওমরা হজ্জ করতে যান শায়খ তফজ্জল আহমদ। হজ্ব থেকে ফেরার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০০৪ সালে ‘মুনিরীয়া তবলীগ ও যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন তার কনিষ্ট পুত্র মাওলানা ছৈয়দ মুহাম্মদ মুনির উল্লাহ। শুরু হয় ভ্রান্ত আকিদায় পথচলা।

এক ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, মুনিরীয়ার যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ এর ব্যানারে আয়োজিত এক সমাবেশে মওলানা মুহাম্মদ আশেকুর রহমান চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেছেন যারা হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র:) এবং ইমাম মেহেদী (আ:) ছাড়া আর কেউ গাউছুল আজম নয় বলে প্রচার করেন তারা অজ্ঞ ও মূর্খ! যুগে যুগে গাউছুল আজম থাকবে। কাগতিয়ার দরবার মুসলিম মিল্লাতকে সঠিক আকিদা উপহার দিয়েছেন। কাগতিয়ার হুজুরকে গাউছুল আজম বলা যাবে না এটা মারাত্বক ভুল।

মওলানা মুহাম্মদ আশেকুর রহমান মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ ও মুনিরীয়া দরবারের পীরের বিরোধীদের উদ্দেশ্য প্রশ্ন করেন, মুসলিম মিল্লাতকে একজন কালজয়ী মনীষী, অলিদের সর্দার থেকে মুসলিম মিল্লাতকে বঞ্চিত করতে চান? কেয়ামতের ময়দানে, আল্লাহ সামনে, রাসুলের সামনে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আল্লাহ আদালতে, নবীর আদালতে মামলা করবেন! দুনিয়ায় টাকা ও জনবলের বাহাদুরিতে রেহাই পেলেও কেয়ামতের ময়দানে রেহাই পাবে না। তওবা করে জমানার গাউছুল আজমের দরবারে ফিরে আসার আহ্বান জানান।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ২৬ মে তওবা করে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ এবং কাগতিয়া দরবারের সঙ্গে সর্ম্পক ছিন্ন করেছেন মওলানা আশিকুর রহমান মুফতি ইব্রাহিম হানফী, মাওলানা এমদাদুল হক মুনিরী, সৈয়দ মো. আবদুল্লাহ রশিদী, মাওলানা মমতাজুল হক নুরী,মওলানা সেকান্দর আলী প্রমূখ। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা তওবা করেন।

মাওলানা আশিকুর রহমান বলেন, বিবেকের তাড়নায় একটি ভুল ও ভ্রান্ত মতবাদের তরিকতের সঙ্গে জড়িত ছিলাম বলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলাম এবং তওবা করার মধ্য দিয়ে নিজেকে হালকা বোধ করছি।

তিনি বলেন, ভণ্ডপীর মুনির উল্লাহর নির্দেশে বিভিন্ন সময় মাহফিলে ওলামাদের দ্বারা নির্ধারিত বক্তব্য লিখিত আকারে পাঠিয়ে পাঠ করা হতো। যা কোরআন, হাদিস তথা ইসলামি শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও উস্কানিমূলক। লিখিত বক্তব্যের বাইরে কিছু বলতে গেলে মুনির উল্লাহর রোষানলের শিকার হতাম এবং অনেক ওলামা বিভিন্ন সময় নির্যাতিত হয়ে সংগঠন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান তিনি।

Print Friendly and PDF

আরো সংবাদ

আর্কাইভ
May 2020
F S S M T W T
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30