ব্রেকিং নিউজ


বিষয় :

টাইপ রাইটার চোর, জিয়ার ‘বিচ্ছু’ সামশু’র আমলনামা


9 October, 2019 10:00 : AM

।। এম.এন.আমিন।।

সামশুল হক চৌধুরী।তিনি ছিলেন ১৯৮০ সালে জাতীয়তাবাদী যুবদলের চট্টগ্রাম ডবলমুরিং থানার যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। ওই সময়ে ৩টি টাইপ রাইটার মেশিন চুরির অপরাধে ১৭ দিন জেলে থাকা সামশুল হক চৌধুরী ওরফে বিচ্ছু সামশু এখন জাতীয় সংসদের হুইপ! দীর্ঘ ২০ বছর পর এ তথ্য ফাঁস করেছেন চট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেড এর প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম।

অনুসন্ধানে  দেখা যায় , ১৯৮০ সালের ২০ আগস্ট তিনটি টাইপ রাইটার মেশিন চুরির দায়ে সামশুল হককে গ্রেফতার করে ডবলমুরিং থানা পুলিশ। ২২ আগস্ট ইংরেজি দৈনিক “দি ডেইলি লাইফ’’ পত্রিকায় এ বিষয়ে সংবাদ প্রচার করেন। সংবাদে বলা হয়, বুধবার বিকেলে (২০ আগস্ট) শেখ মুজিব রোডের বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি টাইপ মেশিন মেরামতের দোকানে তিনটি চোরাই টাইপ মেশিন বিক্রি করতে যান রিয়াজউদ্দিন বাজারের সামশুল হক বিচ্ছু। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে একজন সাব ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে ডবলমুরিং থানা পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। পুলিশ টাইপ মেশিনগুলো জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে ডবলমুরিং থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরের দিন ২৩ আগস্ট এ বিষয়ে খবর প্রচার করে দৈনিক আজাদী।

জুয়া ছাড়া ক্লাব চলবে কী করে?

চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত এবং জুয়ার পক্ষে সাফাই বক্তব্য দেন সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে শতদল, ফ্রেন্ডস, আবাহনী, মোহামেডান মুক্তিযোদ্ধাসহ ১২টি ক্লাব রয়েছে। ক্লাব গুলো প্রিমিয়ার লীগে খেলে। ওদের তো ধ্বংস করা যায় না। হুইপ প্রশ্ন করেন জুয়া ছাড়া ক্লাব চলবে কী করে? প্রশাসন কী খেলোয়াড়দের পাঁচ টাকা বেতন দেয়? জুয়া খেলা বন্ধ হলে চুরি ছিনতাই বেড়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন হুইপ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর অভিযানের সমালোচনা করে ‘টপ অব দি কান্ট্রি’ হওয়া সামশুল হক চৌধুরীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম। তার জের ধরে হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর পুত্র শারুন টেলিফোনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধরের হুমকি দেন। এরপর দিদারুল আলম হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর চাঞ্চল্যকর ইতিহাস তুলে ধরেন গণমাধ্যমে।

জিয়া উপাধি দিয়েছিল ‌‌বিচ্ছু!

উল্লেখ, হুইপ সামশুল হক চৌধুরীকে চট্টগ্রামের মানুষ ‘বিচ্ছু সামশু’ নামে চেনে । কিন্তু কেন তার এমন নাম?  কে দিল এ নাম, এ নিয়ে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে জল্পনা কল্পনা ছিল । সেটিও খোলাসা করেছেন দিদারুল আলম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন ওই বিচ্ছু নামটি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের দেয়া। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় এক জন সভায় মাইকে অন্য একজন থেকে মাইকের স্পিকার কেড়ে নিয়ে জোরে জোরে জিয়াউর রহমানের বন্দনা এবং বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে গালিগালাজ করতে দেখে জিয়াউর রহমান সামশুল হক চৌধুরীকে ওই ‘বিচ্ছু’ উপাধি দেন। তখন  বর্তমান হুইপ সামশুল হক বিএনপির অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের ডবলমুরিং থানার  সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ধূর্ত অর্থে হয়ত জিয়াউর রহমান তাকে সেদিন বিচ্ছু উপাধি দিয়ে ছিলেন।দিদারুল আলমের বক্তব্য সমর্থন করেন নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম।

যেভাবে যুবদলে সামশুল হক

সাবেক সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম বলেন, ১৯৭৯ সালে তিনি নগর যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।তার অধীনে ডবলমুরিং থানা যুবদলের  সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বর্তমান পটিয়ার সংসদ সদস্য শামশুল হক চৌধুরী। আর তার সভাপতি ছিলেন বর্তমান নগর বিএনপির সহসভাপতি সৈয়দ আহমদ।

একরামুল করিম বলেন, জিয়াউর রহমান প্রথম যখন দল করেন তখন একটা কমিটি করেছিলেন। এই কমিটিতে সম্মেলনের মাধ্যমে  ডবলমুরিংয়ের সভাপতি সৈয়দ আহমদ ও সামশুল হককে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। তখন আরিফ মঈনুদ্দীন ত্রাণ ও পুনর্বাসন উপমন্ত্রী ছিলেন।  সে সময় মহানগর যুবদল সভাপতি ছিলেন বাকলিয়ার আবদুর রহিম। তিনিই সৈয়দ আহমদকে সভাপতি  ও সামশুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের কমিটি অনুমোদন দেন। পশ্চিম মাদারবাড়িতে এ কমিটির সম্মেলন  হয়।

জাতীয় পার্টিতে ডিগবাজি

এরশাদের সামরিক আইন জারির পর বিএনপির রাজনীতি থেকে দূরে চলে যান সামশুল হক চৌধুরী। পরবর্তীতে এরশাদ জাতীয় পার্টি গঠন করলে প্রয়াত দস্তগীর চৌধুরীর হাত ধরে জাতীয় যুব সংহতিতে ডিগবাজি দেন এবং আলকরণ ওয়ার্ড কমিশনার হন। যুক্ত হন নিউমার্কেট-আমতলা এলাকার হকারদের সাথে হকার সমিতি গঠন করার মাধ্যমে । নালা ও ফুটপাত দখল করে গড়ে তুলেন অসংখ্য দোকান। ফুটপাত হকারদের থেকে আদায় করা চাঁদা যেত তার কাছে।

 মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি সৈয়দ আহমদ জানান, জাতীয় পার্টির আমলে সামশুল কমিশনার প্রার্থী হয়ে গেলেন, আলকরণের। কমিশনার হওয়ার পর রেয়াজউদ্দিন বাজারে একটা হকার সমিতি করেন সামশুল। সেখানে অনেক টাকা-পয়সার লেনদেন হতো। ওখান থেকেই মূলত তার (সামশুল) উত্থান শুরু। বিশেষ করে টাকা-পয়সার উপার্জন।

আওয়ামী লীগের সভায় বোমা হামলা!

চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদার পৃষ্টপোষকতায় তৎকালীন মাস্তানি শুরু করেন। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের এক স্বৈরাচার বিরোধী  মিটিংয়ে  সামশুল হক বিচ্ছুর নেতৃত্বে বোমা হামলা করা হয়।

আহত হন সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনসহ অনেকে।  বোমা হামলার পর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও সংসদ সদস্য ইসহাক মিয়া প্রকাশ্যে মাইকে সামশুল হক চৌধুরীকে দায়ী করেছিলেন বলে ওই সময়ে সভায় উপস্থিত  মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম জানিয়েছেন।

যেভাবে আবাহনীতে……

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি প্রয়াত দস্তগীর চৌধুরীর সাথে সামশুলের সম্পর্ক ভালো ছিল। দস্তগীর চৌধুরী এক সময় জাতীয়পার্টির রাজনীতি করতেন এবং সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র ছিলেন। কমিশনার হওয়ার কারণে একপর্যায়ে দস্তগীরের সাথে সামশুল হক চৌধুরীর সুসর্ম্পক গড়ে উঠে। দস্তগীর চৌধুরী ওই সময়ে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা (সিজেকেএস) এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দস্তগীর চৌধুরীর হাত ধরে  সামশুল হক চৌধুরী চট্টগ্রাম আবাহনী ক্রীড়া চক্রে  সদস্যপদ লাভ করেন। ওই সময় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বর্তমান মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরী।

জুয়া থেকে মাসিক আয় ১০ লাখ !

চলমান ক্যাসিনো ও জুয়ার  বিরোধীতা করে আলোচিত-সমালোচিত হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আলাদীনের প্রদীপের মতো। সাইফুল আমিন নামের এক পুলিশ পরির্দশক তার ভেরিফাইড ফেসবুকে লিখেছেন সামশুল হক চৌধুরী প্রতিমাসে চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবের জুয়া থেকে মাসিক আয় করতেন ১০ লাখ টাকা।

এক সময় চট্টগ্রামের হালিশহর থানায় কর্মরত ছিলেন পুলিশ পরির্দশক সাইফুল আমিন। তার এ বক্তব্য ভাইরাল হয়। আর্মড পুলিশে কর্মরত সাইফুল আমিন ফেসবুকে পুলিশের বিভিন্ন সমালোচনাও করেন। যদিও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধে তাকে সাময়িক বহিস্কার করা হয়। রুজু হয় বিভাগীয় মামলা।

চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে পরিচিত আলহাজ্ব সামশুল হক চৌধুরী ১৯৯৮ সাল থেকে চট্টগ্রাম আবাহনীর মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এছাড়া ঢাকার শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের পৃষ্ঠপোষক, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সদস্য, চট্টগ্রাম ক্রীড়া সংস্থার কার্যকরী সদস্য, এশিয়ান ফুটবল এসোসিয়েশন ইউকে’র প্রথম সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

খেলোয়াড়ের নামে মানব পাচার

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সামশুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে শুধু জুয়া নয়- অভিযোগ আছে মাদক ও মানব পাচারের। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় সরকারের আমলে লন্ডনে যায় চট্টগ্রাম আবাহনী। ২২ জনের অনুমতি থাকলেও অতিরিক্ত ১৫ জন নিয়ে যান তিনি। ওই সময় বিষয়টি নিয়ে বেশ হৈচৈ পড়ে যায়। চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবের প্রিমিয়ার ব্যাংকের হিসাব নিয়েও নয়-ছয় করার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। আবাহনীর মাঠ বাণিজ্য মেলার জন্য ভাড়া দিয়েও প্রচুর অর্থ হাতানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

হকার নেতা থেকে কোটিপতি

আশির দশকে সামশুল হক চৌধুরী ছিলেন হকার নেতা। হকারদের থেকে চাঁদা নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। এখন তিনি যশ খ্যাতিমান নেতা হওয়ার পাশাপাশি শত কোটি টাকার মালিকও হয়েছেন। দেশে-বিদেশে প্রচুর অর্থ সম্পদ রয়েছে। অথচ সংসদ সদস্য হওয়ার আগে পটিয়ায় গ্রামের বাড়িতে একটি টিনশেড বাড়িতে থাকতেন। এখন সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে আলিশান বাড়ি। হালিশহরে একটি দোতালা একটি বাড়ি ছিল। সেটিও করা হয়েছে চারতলা। ঢাকা-চট্টগ্রামে নামে বেনামে অসংখ্য ফ্ল্যাট-জমিতো রয়েছেই। আওয়ামী লীগে যোগদানের আগে একটি সাধারণ মাইক্রোবাস ছিল। এখন তিনটি অত্যাধুনিক বিলাশবহুল গাড়ি। এ যেন আলাদিনের প্রদীপ!

টাকা আসে যেখান থেকে

জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর আবাহনী ক্লাবের জুয়ার আসর ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে টাকা আসে। এর অন্যতম একটি খাত হচ্ছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামে অবস্থিত বিভিন্ন শিল্প কারখানা। কর্ণফুলী নদী লাগোয়া তার সংসদীয় এলাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্প কারখানা স্থাপিত হয়। ওই সব শিল্প কারখানা মাটি ভরাট থেকে শুরু করে পাথর, রড ইট সিমেন্টসহ সবধরনের নির্মাণ সামগ্রী একক সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণ করেন হুইপ। এ নিয়ে শিকলবাহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর  আলম প্রকাশ জাহাঙ্গীর মেম্বার বাহিনীর সঙ্গে সামশুল হক চৌধুরীর রক্তক্ষয়ী সংর্ঘষ হয়। চাঁদাবাজির মামলায় চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীর আলমের বাহিনী ও সমর্থকরা দুপুর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত রাস্তা অবরোধ করে। সমর্থকদের রাতে মহিষ জবাই করে খাওয়ানো হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সামশুল হকের সঙ্গে সমঝোতা হয়। বিভিন্ন সরবরাহ কাজে এখন দু’জন ভাগাভাগি করে।

হুইপ স্ত্রী ভাইয়ের  একাউন্টে   টাকা সরালেন

জুয়ার পক্ষ নিয়ে যখন সমালোচনার ঝড় ওঠে তখনই জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর স্ত্রী কামরুন নাহার চৌধুরী ৫০ লাখ টাকা সরিয়ে নিয়েছেন। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা থেকে গত ৩০ শে সেপ্টেম্বর নিজের ভাই মো. শাহীন উল্লাহ মুকুলের ব্যাংক হিসেবে এ টাকা সরানো হয়।

২০১৮ সালের ২৮ শে নভেম্বর নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় হুইপ সামশুল হক চৌধুরী তথ্য দিয়েছেন, তার স্ত্রীর নামে নগদ ১৯ লাখ ২ হাজার ২৪৪ টাকা রয়েছে। এছাড়া স্ত্রীর নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে আরও ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৮ টাকা।

জীবন বীমা ব্যবসার মূলধন ও পিস্তল বাবদ স্ত্রীর নামে আরও ২৩ লাখ ১০ হাজার ৫৩০ টাকা রয়েছে। সবমিলিয়ে ২০১৮ সালের ২৮ শে নভেম্বর পর্যন্ত স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে ৬৪ লাখ ১০ হাজার ৪১২ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে বলে হুইপ সামশুল হক নির্বাচন কমিশনকে তথ্য দিয়েছিলেন। ৫০ লাখ টাকা সরানোর পরও এখন ৮১ লাখ ২০ হাজার ৪৫ টাকা জমা আছে। এত অল্প সময়ে হুইপের স্ত্রীর হিসাবে এত টাকা এলো কীভাবে তা নিয়ে তদন্ত করছে দুদক।

কমিটিতে জামায়াত-বিএনপি-জাপা!

তৃণমূল নেতাদের কাছে হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর গ্রহণযোগ্যতা নেই। তার প্রমাণ ২০১৪ সালে ২৪ নভেম্বর সম্মেলন। ওই সম্মেলনে গোপন ভোটে অনুষ্ঠিত সামশুল হক চৌধুরীর প্যানেল বিপুল ভোটে পরাজিত হয়। সভাপতি রাশেদ মনোয়ারের নেতৃত্বাধীন কমিটিকে কোন কার্যকর ভূমিকা রাখতে দেয়নি সামশুল হক চৌধুরী।

পরবর্তীতে সম্মেলন হলেও (বর্তমান কমিটি) বিপর্যয় হতে পারে এ আশঙ্কা থেকে আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতাকে ম্যানেজ করে একক প্যানেলকে নির্বাচিত ঘোষণা করে। নির্বাচনের সব আয়োজন থাকার পরও কেন্দ্রীয় নেতারা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য সেলিম নবীর নেতৃত্বাধীন প্যানেলকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়নি। এ নিয়ে সম্মলনের বাইরে তৃণমূল নেতারা নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা না করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় নেতারা সভাস্থল ত্যাগ করে।

পরবর্তীতে কমিটি গঠনে দলীয় স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন সামশুল হক চৌধুরী। দলে স্থান দিয়েছেন বিএনপি জামায়াতিদের। বর্তমানে উপজেলার কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ এক সময় শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ আছে। কমিটিতে আছে বিএনপির জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন নেতা। একই অভিযোগ ইউনিয়ন কমিটিগুলো নিয়ে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের দক্ষিণ জেলা সাধারণ সম্পাদক বলেন, তিনি নিজেও তো ‌‍‘হাইব্রিড’। তার সার্বিক কর্মকাণ্ডে আমরা বিব্রত।

যখন প্যান্ট শার্ট খুইলা দিমু তখন বুঝবেন !

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের একটি অডিও এবং একটি ভিডিও চট্টগ্রামে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অডিওটি হচ্ছে হুইপের ছেলের সঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলমের টেলিফোনের কথোপকথন। কী ছিল দিদারুল ও শারুনের কথোপকথনে? তার অংশ বিশেষ তুলে ধরা হলো—

শারুন : আর আঙ্কেল আপনি ওই  চিঠিটা উইথড্র করে ফেলবেন। ওটা দরকার নাই।

দিদারুল : ঐটা… ঐটা ক্লাবের বিষয়। ওটা আমি তোমার আব্বার সঙ্গে বসে কথা বলব। ওকে।

শারুন : ঐগুলা…ঐগুলা দরকার আছে শুধু শুধু?

দিদারুল : আশ্চর্য কথা এনা। আমার যে…

শারুন : ঐটা দিয়ে কিছু হবে যে না। এটা আপনার প্রতি আমাদের…

দিদারুল : না হইলে মনে করো আমার একটা আপত্তি থাকলে ভবিষ্যতে …

শারুন : ঠিক আছে আপনার আপত্তি আপনি রাখেন। আমরা এইরকম কতো আপত্তি দিতে পারি না বিভিন্ন জায়গায়…

দিদারুল : ঠিক আছে। তুমি রবিবারে আস।

শারুন : আপত্তি কি এখানে আপনি একা দিতে পারেন নাকি? আপত্তি তো আমরাও দিতে পারি।

দিদারুল : ক্লাবের ব্যাপারে তোমার আব্বার সঙ্গে বসে কথা বলব।

শারুন : ক্লাবের ব্যাপারে কিসের কথা? ক্লাবের ব্যাপারে যা কথা হওয়ার হইছে আর কথা বলার দরকার নেই। আপনি আপনার ক্ষমতা দেখাইছেন তো, এখন আমাদেরটা আমরা দেখাব।

দিদারুল : ক্ষমতা-টমতা কিচ্ছু না।

শারুন : দেখাইছেন তো। আপনি ক্ষমতা দেখাচ্ছেন না?

দিদারুল : আমাদের সেইফের জন্য করতে হবে না?

শারুন : আমরা যদি ক্ষমতা দেখাই আপনি এক শতাংশও টিকতে পারবেন?

দিদারুল : না না, আমি ১০০ শতাংশ টিকতে পারব। আমি হইলাম শেখ মুজিবের আদর্শিক সন্তান।

শারুন : এগুলা… এগুলা আঙ্কেল… এইসব, এইসব, এইসব গালগোল অন্য জায়গায় কইরেন। আমার সঙ্গে কইরেন না। আমি সম্মান দিছি সম্মান নিয়ে থাইকেন।

দিদারুল : শোন আমি সাগরেদ নই। তোমার আব্বা তো জাতীয় পার্টি করে, এখন আওয়ামী লীগে আইসা…

শারুন : এগুলা শেখ হাসিনা বুঝবে। আপনার বোঝার দরকার নাই। রাখেন মিয়া ফালতু।

দিদারুল : আমরা তো শাহজাদা, সাগরেদ না।

শারুন : আমি আপনাকে সম্মান দিয়ে কথা বলছি গায়ে লাগতেছে না?

দিদারুল : আমি তোমাকে এজন্যই ফোন দিই নাই। তুমি এক কাজ করো রবিবারে আইসা…

শারুন : রাস্তাঘাটে যখন প্যান্ট শার্ট খুইলা দিমু তখন বুঝবেন। বেয়াদবি তো এখনো দেখেন নাই। সম্মান করে কথা বলছি গায়ে লাগতেছে না?

দিদারুল : অ্যাঁ অ্যাঁ? তুমি রাস্তাঘাটে!!!

শারুন : আপনি উলটাপালটা কথা বলতেছেন কিসের জন্য?

দিদারুল : উলটাপালটা কী বললাম? আরে শোনো তোমার বাবা বিএনপি-যুবদলে এরপর জাতীয় পার্টি কইরা এখন—

শারুন : গালবাজি যেডে এডে গরিবি রাস্তাঘাটত চোয়ারাই গালর দাঁত বেয়াগ্গুন ফেলাই দিইয়ুম। বেয়াদব হডিয়ার! (গালবাজি যেখানে সেখানে করবি রাস্তাঘাটে চড় মেরে মুখের দাঁত সবগুলো ফেলে দেব। বেয়াদব কোথাকার!)

দিদারুল : এরপরে জাতীয় পার্টি গরি।

শারুন : এই মিয়া তোরে রাস্তাত ধরি পিডিব মাইনস্যে। বেয়াদব! তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ দে? এই তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ দে? তোরে আঁই ফোন দিতো হয়িলাম না? তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ? (এই মিয়া তোকে রাস্তায় ধরে পেটাবে মানুষ। বেয়াদব! তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস? এই তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস? তোকে আমি ফোন দিতে বলেছিলাম? তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস?)

দিদারুল : আমি তো অর্জিনাল।

শারুন : তোরে আঁই ফোন দিতো হয়িলাম না? তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ দে? (তোকে আমি ফোন দিতে বলেছিলাম? তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস?)

দিদারুল : এই দেখ না তোমার বেসিক, যেটা সেটা তুমি উলটাপালটা, এটাই তো তোমাদের বেসিক।

শারুন : তুমি আমারে ফোন দিছ কেন? ফালতু কোথাকার। আমার বাপে যেটা করবে করুক না। আমার বাবা হুইপ। আর তুমি এসব গালবাজি করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেছো।

দিদারুল : রাস্তাঘাটে তুই প্যান্ট খুলিবিদে ব্যাডা! (রাস্তাঘাটে তুমি প্যান্ট খুলবে ব্যাটা!)

শারুন : আমি খুলব না। মানুষজনে খুলবে যে।

প্রধানমন্ত্রীর সফর থেকে বাদ শারুন

জুয়ার পক্ষে অবস্থান ও চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবে র‌্যাব-পুলিশের সমালোচনা করে বিতর্কিত হন হুইপ ও চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবের নিয়ন্ত্রক সামশুল হক চৌধুরী। জুয়ার আসর থেকে টাকা নিতেন তিনি।এ অভিযোগ খোদ আওয়ামী লীগের একাংশের । তার সূত্র ধরে পিতাসম আওয়ামী লীগ নেতা ও চট্টগ্রাম আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা দিদারুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে অশোভন আচরণ করে  হুইপপুত্র শারুন। পিতৃতূল্য দিদারুল আলমের সঙ্গে এমন আচরণে আওয়ামী লীগের মধ্যে বেশ ক্ষোভ দেখা দেয়। এ নিয়ে হুইপপুত্রের অডিও ফাঁস হওয়ার ২৪ ঘণ্টা না যেতেই একে-৪৭ রাইফেল হাতে যুদ্ধংদেহী মনোভাবে উপর্যুপরি ফায়ার এবং বিদেশি মদ বিলাসের ভিডিও এবং ছবি ভাইরাল হয় ফেসবুকে। সেই সূত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরসঙ্গীর তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন হুইপ পুত্র সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে ও আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন।

জামায়াত বানানো বাকি রয়েছে -সামশুল হক চৌধুরী

এ ব্যাপারে সামশুল হক চৌধুরী বলেন, সবই ষড়যন্ত্র। আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষানিত হয়ে মহল বিশেষ আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক, মিথ্যা,অবাস্তব, কাল্পনিক তথ্য উপস্থাপন করছেন।‘আমাকে বিএনপি, জাতীয় পার্টি অনেক কিছু বানানো হচ্ছে। জামায়াত বানানো বাকি রয়েছে। আমি শেখ হাসিনার প্রোডাক্ট। কেউ কিছু বললেই কী হবে? আমি কী ছিলাম, কী ছিলাম না, তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভাল জানেন।

বিএনএনিউজ২৪.কম/এমএফ,এসজিএন,এহক।

Print Friendly and PDF

আরো সংবাদ

আর্কাইভ
অক্টোবর ২০১৯
শুক্র শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ
« সেপ্টেম্বর   নভেম্বর »
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১