ব্রেকিং নিউজ

প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা প্রচেষ্টাকারি ফ্রিডম মিজানের আমলনামা


১১ অক্টোবর, ২০১৯ ৬:২৪ : অপরাহ্ণ

।।মনির ফয়সাল।।

হাবিবুর রহমান মিজান। ১৯৭৪ সালে ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় এসে হোটেল বয় হিসাবে জীবিকা শুরু করেন।হোটেল বয়ের কাজ ছেড়ে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করে তা আবার সিটি করপোরেশনের কাছে বিক্রি করতেন। ছিনতাইকারী হিসেবে পান পাগলা মিজান খ্যাতি। ফ্রিডম পার্টি, বিএনপি, আওয়ামী লীগ সব দলে ছিলেন তিনি। ডিগবাজি দিয়ে নানা কৌশলে শুক্রবার (১১অক্টোবর) ভারত পালিয়ে যাবার আগে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন। এরপর বেরিয়ে আসে হাল আমলের আওয়ামী লীগের এই প্রভাবশালী নেতা ও ১৯৯৪ থেকে টানা ২৪ বছরের কাউন্সিলর মিজানুর রহমান প্রকাশ ফ্রিডম মিজানের অপকর্মের নানা তথ্য ও অজানা কাহিনী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ফ্রিডম পার্টির হামলার ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে হাবিবুর রহমান মিজানের বিরুদ্ধে। যে দল ক্ষমতায় আসুক না কেন তখন ক্ষমতায় থাকেন তিনি। পরে নেতাদের আশীর্বাদে মোহাম্মদপুরে গড়ে তুলেন অপরাধ সাম্রাজ্য। মাদক কারবার থেকে শুরু করে খুন-খারাবি পর্যন্ত নানা অপরাধমূলক কাণ্ডে তার নাম বারবার উঠে এসেছে ।

ফ্রিডম মিজানের একাল সেকাল

হাবিবুর রহমান মিজান ১৯৭৪ সালে ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় আসেন। শুরুতে তিনি মিরপুরে হোটেল বয়ের কাজ করেন। এরপর মোহাম্মদপুরে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি শুরু করে সেই ঢাকনা বিক্রি করতেন সিটি করপোরেশনের কাছে। সময়ের স্রোতে এখন তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা।

হাবিবুর রহমান মিজান ফ্রিডম পার্টির মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও যে দল ক্ষমতায় আসে ওই দলই করতেন। কখনো বিএনপি আবার কখনো আওয়ামী লীগ। এভাবে দল পাল্টে রাতারাতি বনে যান ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা।

অভিযোগ রযেছে, বর্তমান সরকারের ১১ বছরে  মিজান  শুধু টেন্ডারবাজির মাধ্যমে আয় করেছেন ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা। এছাড়া ভূমিদখল, চাঁদাবাজিসহ মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পে মাদক ও চোরাই গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণতো আছেই। খুন-খারাবি ফ্রিডম  মিজানের নিত্যদিনের কারবার। তার ভয়ে এলাকায় কেউ  প্রতিবাদ করা দূরে থাক  কথাও বলেন না।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে মোহাম্মদপুর এলাকায় ৬৫ বছরের বৃদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আহমেদ পাইন ও তার অসুস্থ স্ত্রী মরিয়ম বেগমকে তুচ্ছ ঘটনায় শত শত মানুষের সামনে জুতাপেটা করেন  মিজান। তার ভয়ে কেউ  কথা বলেননি। মিজান শ্যামলী মাঠের পশ্চিম পাশের জমির একাংশ দখল করে বানিয়েছেন মার্কেট। সেখানে তিন শতাধিক দোকানঘর তুলে ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের অনেক প্রভাবশালী নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা তার অপকর্মে সহযোগিতা করেন। এ কারণে  তিনি পাহাড়সম অপরাধ করেও পার পেয়ে যান বার বার।

প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা প্রচেষ্ঠা

১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ফ্রিডম পার্টির সদস্য কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা চালায়। গুলির পাশাপাশি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। সে সময় বাড়ির ভেতর অবস্থান করছিলেন শেখ হাসিনা। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরা পাল্টা গুলি চালালে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছিল এ হামলায়। ওই  সময় মিজান ছিলেন ফ্রিডম পার্টির বড় নেতা।  এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় মামলা হয়। ১৯৯৭ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয়। এতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুর রশিদ ও মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) বজলুল হুদা এবং নাজমুল মাকসুদ মুরাদসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়।

অভিযোগপত্রে ফ্রিডম পার্টির তৎকালীন  নেতা বতর্মানে আওয়ামীলীগ নেতা কাউন্সিলর মিজানকে হামলার পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মিজানের ছোটো ভাই মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাও ছিলেন হামলাকারী দলের সদস্য। মোস্তফা ১৯৯৫ সালে দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে মারা যান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭৬ সালে ফ্রিডম পার্টির পক্ষ থেকে মিজান, শামীম জালালী ওরফে দারোগার ছেলে শামীম, বাবুল ওরফে পিচ্চি বাবুলসহ কয়েক জন লিবিয়া যান গেরিলা ট্রেনিং নিতে। হামলার ঘটনার সময় মিজান ছিলেন ফ্রিডম পার্টির ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর জোনের কো-অর্ডিনেটর।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মহাজোট সরকারের আমলে মিজান বাহিনী ৩০০থেকে ৪০০ কোটি টাকার শুধু টেন্ডারবাজি করেছে। এছাড়া ভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পে মাদক ও চোরাই গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবসার নিয়ন্ত্রক তিনি। বর্তমানে চলমান সন্ত্রাসবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও একাধিক খুনের মামলা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

ছিনতাইকারী মিজান যেভাবে রক্ষা পেল

পাগলা মিজান ঢাকায় আসার পর মোহাম্মদপুর এলাকায় শুরু করেন চাঁদাবাজি, ছিনতাই। আর ওই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর এখন তিনি। ছিনতাইকারী হিসেবেই পরিচয় ছিল এলাকায় তার। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে খামারবাড়ী খেজুরবাগান এলাকায় ছিনতাই করতে গিয়ে পুলিশের ধাওয়ায় লালমাটিয়ায় মসজিদের পাশে পুকুরে নেমে পড়েন মিজান। পুলিশ পুকুরের চারপাশে ঘিরে ফেলে। তাকে পুকুর থেকে উঠার নির্দেশ দিলেও সে উঠেনি। অবশেষে পরনের কাপড় ছাড়াই ৪-৫ ঘণ্টা পর পুকুর থেকে উঠে আসেন। তার এমন আচরণে পুলিশ পাগল বলে ছেড়ে দেয়। আর তখন থেকেই পাগলা মিজান নামে এলাকায় তার নাম ছড়িয়ে পড়ে ।

ফ্রিডম মিজানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

মোহাম্মদপুর থানায় ১৯৯৬ সালে ইউনূস হত্যা ও ২০১৬ সালে সাভার থানায় জোড়া হত্যার মামলা রয়েছে তার নামে । জমি দখলকে কেন্দ্র করে গত বছর একদল সন্ত্রাসী মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান সংলগ্ন তুরাগ নদের ওপারে একটি রিয়েল এস্টেটের ছয় কর্মীকে গুলি এবং আরও ১৪ জনকে কুপিয়ে জখম করে। সন্ত্রাসীরা জুয়েল নামের একজনকে হত্যা করে মরদেহ তুরাগ নদে ফেলে দেয়। এ হত্যায়ও  মিজানের নাম উঠে এসেছে।

জেনেভা ক্যাম্পের গডফাদার

সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে পুলিশের সঙ্গে ক্যাম্পবাসীর সংঘর্ষের নেপথ্যেও তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। মিজান ক্যাম্পের বিদ্যুৎ লাইন থেকে ক্যাম্প-লাগোয়া কাঁচাবাজার ও তিন শতাধিক মাছের দোকানে অবৈধ সংযোগ দিয়ে মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় করতেন। এ কারণেই বিদ্যুৎ অফিসের সঙ্গে ক্যাম্পবাসীর ঝামেলার সূত্রপাত।

উল্লেখ, দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় হাবিবুর রহমান মিজানকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গুহ রোডের হামিদা আবাসিক গেস্ট হাউজের সামনে থেকে তাকে আটক করেছে র‌্যাব।

বিদেশে বাড়ি গাড়ি :

শুক্রবার (১১ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোডে অভিযান চালিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের বাসা থেকে ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ব্যাংক চেক, ১ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও ২ লাখ নগদ টাকা উদ্ধার করেছে র‌্যাব।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম গণমাধ্যমকে জানান, এই বিপুল অংকের টাকার কোনো উৎস দেখাতে পারেননি মিজান। র‍্যাবকে মিজান জানিয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হিসেবে প্রাপ্ত ভাতা বাদের আয়ের তেমন উৎস নেই তার। এছাড়া ভাড়া দেওয়া তিনটি বাড়ি থেকে ৯০ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। তবে, টাকার উৎস না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বাড়ি রয়েছে তার। সেখানে তার বিলাসবহুল কয়েকটি গাড়িও রয়েছে।

বিএনএনিউজ২৪.কম/এসএম,এহক।

Print Friendly and PDF

আরো সংবাদ

আর্কাইভ
October 2019
F S S M T W T
« Sep   Oct »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930