সোমবার, ২০ জানুয়ারি ২০২০

ব্রেকিং নিউজ

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-২


৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১০:৩২ : অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার ‘কাগতিয়া আলীয়া গাউছুল আজম দরবার শরীফ’। এ দরবারকে ঘিরে গঠিত হয়েছে ‘‌মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’। দু’টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ সৈয়দ তফজ্জল আহমদ। তিনি পবিত্র কুরআন ও হাদীস বিষয়ে  বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এলাকার মানুষকে নামায কায়েম, রোজা, হজ্ব পালন ও জাকাত প্রদানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার আহ্বান জানাতেন। ধর্ম নিয়ে কোন ধরনের গোঁড়ামি, অলৌকিক ক্ষমতার জাহির, প্রচার কোনটাই করেননি।

সৈয়দ তফজ্জল আহমদ এর তিন সন্তান থাকলেও বড় দুই সন্তানকে দরবার থেকে বিতাড়িত করেন কনিষ্ঠপুত্র মুনিরউল্লাহ আহমদী। শায়খ তফজ্জল আহমদ শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে তিনি(মুনিরউল্লাহ) নানা বিতর্কিত, মনগড়া অলৌকিক কেরামত প্রচার করতে থাকেন। সফলও হয়েছেন। এখন মুনিরউল্লাহ আহমদী স্বনামে-বেনামে শতকোটি টাকার মালিক! কী ছিল মুনিরীয়ার দর্শন? কে, কখন, কোথায়, কীভাবে, কাদের কাছে অলৌকিক কেরামত প্রচার করতেন মুনিরউল্লাহ আহমদী ও তার সহযোগীরা? তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি(বিএনএ)।অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে কথিত‘‌‌মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’তথা মুনিরউল্লাহ এর ভণ্ডামির নানা তথ্য। বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি(বিএনএ)’র হেড অব নিউজ ইয়াসীন হীরা’র অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-২

২০০৪ সাল থেকে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেন মুনিরীয়াদের পীর তফজ্জল আহমদের কনিষ্টপুত্র মুনিরুল্লাহ আহমদী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ ফোরকান মিয়া।বর্তমানে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশে’র মহাসচিব ফোরকান মিয়া প্রথম কাগিতিয়া দরবারের পীর তফজ্জল আহমদকে এ যুগের গাউছুল আজম বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ২০০৩ সালে রসুল (স:) মদীনায় স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে শায়খ তফজ্জল আহমদকে খেলাফত দিয়েছেন। তিনি মুরিদের বিপদে সাহায্য করতে পারেন, মৃত্যুকালে কালেমা পড়াতে পারেন। এমনকি গুনাহ মাফ করার ক্ষমতা রাখেন! অধ্যাপক ফোরকান মিয়া গত দেড় যুগ ধরে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ আয়োজিত সব সম্মেলন, মাহফিলে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকেন। ওই সব সম্মেলন, মাহফিলে কবিতার সুরে সুরে কাগতিয়া দরবারের পীর কথিত কেরামত বর্ণনা ও মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশের গুনগান করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে ফটিকছড়ির নানুপুর লায়লা কবির কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ফোরকান মিয়া নিজের জীবনে সংগঠিত একটি কেরামত মুনিরীয়ার মুরিদদের উদ্দেশ্যে বর্ণণা করেছেন। একজন শিক্ষকের নিজের মুখে এমন কেরামত শুনে রাতারাতি কাগতিয়া দরবারে মুরিদ সংখ্যা বাড়তে থাকে। এটিই প্রথম কথিত গাউছুল আজমের কেরামত।ফোরকান মিয়ার জীবনের ঘটনা প্রচারের মাধ্যমে ভন্ডামির জগতে প্রবেশ করেন মুনিরীয়া দরবার। এরপর কেরামতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কাগতিয়া আলীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক-মওলানারা মুনিরীয়ার বিভিন্ন মাহফিলে ফোরকান মিয়ার বরাত দিয়ে মুরিদ ও সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের বানানো কেরামত সমূহ প্রচার করতে থাকে।

যেভাবে পরীক্ষা প্রশ্ন পেল ফোরকান

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ’র বিভিন্ন প্রকাশনায় সংগঠনটির মহাসচিব ফোরকান মিয়া মুনিরীয়াদের পীর কথিত গাউছুল আজম থেকে প্রশ্ন পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হয়।এ কেরামতের ব্যাপক ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ‌দৈনিক ইনকিলাবসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রের ক্রোড়পত্রে প্রচার করা হয়। এতে লেখা হয়-

ফোরকান মিয়া। ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্স এর পরীক্ষার্থী ছিলেন। ষষ্ঠ পত্র পরীক্ষার আগের দিন গভীর রাত পর্যন্ত কাগতিয়া আলীয়া গাউছুল আজম দরবার শরীফের তরিক্বতের মাহফিলে সাংগঠনিক কাজ করেন। ফলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ পাননি। সকালে পরীক্ষা।এ অবস্থায় চিন্তিত মনে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।রাত আনুমানিক তিনটার সময় তাহাজ্জুদ নামাজের পূর্বে তিনি স্বপ্নে গাউছুল আজমকে (শায়খ তফজ্জল আহমদ) দেখতে পান। গাউছুল আজম ফোরকানকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, “হে ফোরকান! তুমি তো দরবারের কাজ করতে গিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালভাবে নিতে পারোনি। তোমার নোটগুলো আমাকে একটু দাওতো। তিনি স্বপ্নের মধ্যে গাউছুল আজমকে তার পার্শ্বে থাকা বুকসেল্ফ থেকে নোট খাতাটি দিলেন আর গাউছুল আজম মার্কিং করে করে বলছেন-তুমি এই এই প্রশ্নগুলো দেখে নিও। সাথে সাথে তার ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং পার্শ্বে থাকা নোট খাতাটি নিয়ে স্বপ্নে দেখা গাউছুল আজমের দেয়া প্রশ্নগুলো চিহ্নিত করে তাহাজ্জুদ পড়ে ভালোভাবে পড়ে নিলেন।সকাল নয়টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে দেখলেন, আল্লাহ কি মহিমা! গাউছুল আজমের মার্কিং করা সব প্রশ্ন হুবহু প্রশ্ন পত্রে বিদ্যমান’’।

উল্লেখিত ঘটনাটি মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির প্রকাশিত ক্রোড়পত্র ছাড়াও ২০১৬ সালের ৪ মে ‘আল হাবীব মা‌‘আল হাবীবে ফিল হিসরা’ নামে যে স্মরণিকা প্রকাশ করা হয় সেই স্বরণিকার ১৩৯ পৃষ্টায় বিস্তারিত বিররণ রয়েছে।

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে; ফটিকছড়ির নানুপুর লায়লা কবির কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ফোরকান মিয়ার মেধা-যোগ্যতা নিয়ে। মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রশ্ন পেয়েই পরীক্ষার হলে গিয়েছেন ফোরকান মিয়া। তার স্বপ্নের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এশায়েত সম্মেলনের ক্রোড়পত্রে ও বিভিন্ন প্রকাশনায়।

বিষয়টি যদি সত্য হয়, তা হলে এটি প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মদ ফোরকান মিয়া মেধাবি নন। তার শিক্ষক হওয়ার কোন যোগ্যতাও ছিল না। প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তিনি মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন! তার মেধা যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি তদন্তের দাবি তুলেছে মুনিরীয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেয়া রাউজানের সচেতন নাগরিকরা।

অভিযোগ আছে, ফোরকান মিয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অরাজনৈতিক তরিক্বতভিত্তিক আধ্যাত্বিক সংগঠন মুরিনীয়া যুবতবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ’র শাখা খুলেন এবং প্রথম সারির নেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনিই সংগঠনটির প্রধান পরার্মশক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ইসলামী ছাত্রশিবিরের দূর্গ। অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন হিসাবে ইসলামী ছাত্রশিবির আত্মপ্রকাশ করলেও পেছনে ছিল জামায়েত ইসলামীর পৃষ্টপোষকতা। অনুরূপভাবে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি  অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও স্বাধীনতা বিরোধীদের পৃষ্টপোষকতা ছিল তার পেছনে। এছাড়া অরাজনৈতিক লেবাসে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিটি সরকারের আমলে তারা নানা সুযোগ সুবিধা নিয়েছে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’র সঙ্গে জড়িত শীর্ষ পদে আসীন ব্যক্তিরা।

মুনিরীয়া যুবতবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ’র মহাসচিব অধ্যাপক ফোরকান মিয়া মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি প্রকাশিত সব ধরনের প্রকাশনা সম্পাদন করে থাকেন। কল্পকাহিনীর বেশীর ভাগই তার নির্দেশনা অনুযায়ি প্রকাশিত হয়। যা বিভিন্ন এশায়েত সম্মেলন ও বিভিন্ন মাহফিলে সংগঠনটির সভাপতি মুনিরউল্লাহ আহমদী কাগতিয়া মাদ্রাসার শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রচার করতেন।মুনিরউল্লাহ ও ফোরকান মিয়া উভয়ে কথিত গাউছুল আজমের কেরামত বর্নণা করতেন।

 

প্রসঙ্গত: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর রাউজানে স্বাধীনতা বিরোধী সন্ত্রাসীদের একটি অংশ মুনিরীয়া যুব তবলীগে যোগ দিয়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখে।২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মুনিরীয়ার ছত্রছায়ায় তারা আবারো এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। ২০০৪ সালের এপ্রিলে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশের নামে প্রবাসীদের পাঠানো হুন্ডির টাকা আত্মসাৎ করে আবু তাহের চেয়ারম্যান। এর জেরে তাকে হত্যা করে মুনিরীয়া দরবারের ছত্রছায়ায় থাকা বিএনপি’র সন্ত্রাসীরা। আবু বক্কর চৌধুরী প্রকাশ করোলি বক্কর নামে সাবেক এক এনডিপি নেতার পরার্মশে প্রয়াত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (মানবতা বিরোধী অপরাধে ফাঁসিতে মৃত্যুবরণকারি)এবং গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার দায় চাপিয়ে দেয় আওয়ামী লীগের ওপর। মামলায় আসামি করা হয় ওই সময়ের রাউজানের সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, তার ভাই ফজলে শহীদ চৌধুরী, বর্তমান রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ সদস্য কাজী আব্দুল ওহাবসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকে।  চলবে-

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন: মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-০১

 

Print Friendly and PDF

আরো সংবাদ

আর্কাইভ
December 2019
F S S M T W T
« Nov   Dec »
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930