বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ব্রেকিং নিউজ


বিষয় :

শীতল পাটির কদর হ্রাস : দুর্দিনে ময়মনসিংহের পাটিয়ারা


১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ৩:৩১ : অপরাহ্ণ

।।হামিমুর রহমান।।

আধুনিকতার যুগে প্লাষ্টিক শিল্পের কাছে মার খেয়ে হারিয়ে যাচ্ছে বেত গাছ থেকে হাতে তৈরী শীতল পাটির শিল্প। আগের মত আর কদর নেই পরিবেশ বান্ধব এই শীতল পাটির। ফলে এই শিল্পের সাথে জড়িত ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কান্দানিয়া-বন্যাবাড়ির পাইট্যা (পাটিয়া) পাড়ার অর্ধশত পরিবার এখন আর আগের মত ভাল নেই। বংশ পরম্পরায় পেশাকে আঁকড়ে ধরে রাখা এখানকার পাটিয়ালদের সংসার চলছে অতি কষ্টে।

তবুও বাপ-দাদার পেশাকে আকঁড়ে ধরে পড়ে আছেন এখনকার ৪৭/৪৮টি পরিবার। প্রাচীন এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করছেন বাঙালির ঐহিত্য বয়ে চলা এখানকার পাটি শিল্পীরা।

দাড়ালো দা দিয়ে বেত চিড়ে পাটির সরঞ্জাম প্রস্তুতে ব্যস্ত নিরঞ্জন চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমার বাবা, দাদা কিংবা তারও আগে থেকেই বংশ পরম্পরায় বেত দিয়ে শীতল পাটি তৈরীর শিল্পের সাথে আমরা জড়িত। যুগ যুগ ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বী এ পাড়ার সবার প্রধান পেশাই এটি। আমরা ছোট থেকেই অন্য কোন কাজ শিখিনি। এখন আর এ শিল্পের ভবিষ্যত ভাল দেখছি না।’ তিনি বলেন, তার দুই সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে টাঙ্গাইলের একটি কলেজে অনার্সে পড়ছে। ছোট মেয়ে প্রাইমারীতে পড়ছে। সন্তানদের আর কষ্টের এ পেশায় রাখতে চান না তিনি।

পাটি তৈরীতে ব্যস্ত গৃহবধূ বিদ্যুৎ রানী দাস বলেন, পুরুষরা বাগান থেকে বেত কেটে প্রক্রিয়াজাত করে দেয়। আর নারীরা নানান ধরনের শীতল পাটি তৈরী করেন। এভাবে ভাল মানের একটি শীতল পাটি তৈরী করতে ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। পরে সেটি মান বেঁধে ৭শ থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এভাবেই কোন রকমে তাদের সংসার চলে। আগে দূর দূরান্ত থেকে পাইকাররা এসে তাদের পাটি কিনে নিত। অনেক সময় পূর্ব থেকে পাটির জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে অর্ডার দিয়ে যেতেন ক্রেতারা। কিন্তু আগের মত শীতল পাটির এখন আর তেমন কদর নেই বলেও জানান তিনি।

অধীর চন্দ্র দাস বলেন, এক সময় এখানকার সবাই শীতল পাটির সাথে যুক্ত ছিল। ১৯৪৭ এ দেশ ভাগের সময় অনেকেই দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। এখন এখানে ৪৭/৪৮টি পরিবার এ শিল্পকে আকঁড়ে ধরে পড়ে আছেন। এখানে সেদ্ধ শীতল পাটি, আওলা শীতল পাটি এবং ডালা পাটি তৈরী হয়। যার কদর সর্বত্র। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকা এবং ঢাকা, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের তৈরী শীতল পাটি বিক্রি হয়। তিনি বলেন, আধুনিক প্লাষ্টিক শিল্পের দাপটে তাদের পাটি শিল্প মার খাচ্ছে। সারা বছর এক রকম বিক্রি হয় না তাই পুঁজির টান পড়ে এ দরিদ্র শিল্পীদের। সেক্ষেত্রে তিনি সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণসহ সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার দাবী জানান। পরিবেশ বান্দব এ শিল্পকে বাঁচাতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

নিজে কাজ করার পাশাপাশি পাড়ার অন্যদের কাছ থেকে পাইকারী দরে পাটি কিনে বিভিন্ন হাটে বিক্রি করা গোপাল চন্দ্র দাস বলেন, পাইকারী কিনে বাজারে বিক্রি করলে পাটি প্রতি ৫০/১০০ টাকা লাভ থাকে। এতে দরিদ্র স্বজাতীয়দেরকেও সাহায্য করা হয়। আবার নিজের সংসারও চলে। তিনিও এ শিল্পকে বাঁচাতে তাদের পাড়ায় যেন সরকারের সুদৃষ্টি পড়ে তেমন আকুতি জানান।

পড়ালেখার পাশাপাশি বাবা-মাকে পাটি তৈরীর কাজে সাহায্য করা কলেজ ছাত্র হৃদয় দাশ বলেন, বাপ-দাদার এ পেশার প্রতি মায়া আছে কিন্তু এর তো ভবিষ্যৎ ভাল দেখা যাচ্ছে না। তাই সে এখন সংসার চলার জন্য বাবা-মাকে সাহায্য করছেন ঠিকই কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে তিনি পড়ালেখা শেষ করে অন্য যেকোন পেশায় চলে যেতে চান। হৃদয়ের আক্ষেপ, তারা অনেক কষ্ট করলেও যথেষ্ট অর্থ না থাকায় সমাজে তাদের খুব ভাল অবস্থান নেই। তারপরও তিনি এ শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের সাহায্য প্রার্থনা করেন।

মায়া রানী দাস (৫২) ও দুলাল দাস (৬০) দম্পতির দাবী পাইট্যা পাড়ার পাটিয়ালদের আর আগের দিন নাই। এখন অনেক কষ্টে চলে তাদের দিন। এক প্রতিবন্ধি সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে এখন তার স্বামীকে পাটি তৈরীর পাশাপাশি অন্যের জমিতে কৃষি কাজে দিনমজুরী করতে হয়।

মায়া রানী অতীত স্মৃতি স্মরণে এনে বলেন, আগে যখন পাটির কদর ছিল, তখন কি ঝাঁকঝমক পূর্ণ ছিল পাটিয়ালদের জীবন। তখন রাতের বেলায় প্রায়ই একেক বাড়িতে গানের আসর বসতো। নিয়মিত পূজা-অর্চনা চলতো বাড়িতে বাড়িতে। কিন্তু এখন এই পাইট্যা পাড়ায় কেবল অভাব আর অনটন। কেউ খুব ভাল নেই।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহীনুর মল্লিক জীবন বলেন, আমরা তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো। সেই সাথে নির্দিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে এই শীতল পাটির শিল্পকে টিকিয়ে রেখে এই পেশার মানুষগুলোকে স্বচ্ছলতার পথ তৈরী করে দিতে সরকারের প্রতি দাবী জানান তিনি।

ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল ছিদ্দিক বলেন, ফুলবাড়িয়ায় বেত শিল্প সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি শুনে আমার খুবই ভালো লেগেছে। খুব শীগ্রই খোঁজ নিয়ে বেত শিল্পের সাথে সম্পৃক্তদেরকে সরকারি ভাবে কোন প্রকল্পের আওতায় আনার চেষ্টা করব।

বিএনএনিউজ/এসজিএন

Print Friendly and PDF

আরো সংবাদ

আর্কাইভ
February 2020
FSSMTWT
« Jan  
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031