বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ব্রেকিং নিউজ

ভাঙাচোরা রাস্তা, যানজট, আবর্জনার স্তূপ, মেগা ঢাকায় স্বাগত!


১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ৪:৩৬ : অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাইনবোর্ড চড়েছে দামি, বাংলার মেগাসিটি! আদতে এমন শহর, যেখানে বর্ষায় কোনটি রাস্তা আর কোনটি নর্দমা বুঝে ওঠাই মুশকিল! শুধু বর্ষায়? সব মৌসুমেই রাস্তায় আবর্জনার স্তূপ আর খানা-খন্দ এখানে নিত্যচিত্র।
এ শহরে যানজটে পথচলা দায়। প্রতিদিন অবাধে চলছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে মশার উৎপাত এখানে নিত্যসঙ্গী। খাল-নালা-ফুটপাতের অনেকটাই অবৈধ দখলে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণে নিজেদের গড়া রেকর্ড ভাঙে প্রতি বছর।
বলছি ঢাকার কথা। সারা বিশ্বে ধীরে ধীরে বাসঅযোগ্য হয়ে ওঠা নগরীর তালিকায় প্রথম দিকেই আছে বাংলাদেশের রাজধানী।
যানজটের নগরী হিসেবে ঢাকার রয়েছে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি। পৃথিবীর আর কোনো মেগাসিটিতে এত ভাঙাচোরা রাস্তা খুঁজে পাওয়া দায়। জলাবদ্ধতা রাজধানীর একাংশের ঘাড়ে এমনভাবে চেপে বসেছে যে, বর্ষায় বৃষ্টি হলেই নগরীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কে হাঁটু পানি জমে যায়।

সড়কে অব্যবস্থাপনা
রাজধানীর অপ্রতুল সড়কের ৩০ ভাগই বেদখলে। বাকি রাস্তার সত্তর ভাগ এক শতাংশ মানুষের প্রাইভেট কারের দখলে থাকছে। একটি আধুনিক নগরীতে সড়ক লাগে মোট আয়তনের ২০ থেকে ২৫ ভাগ। কিন্তু ঢাকায় আছে মাত্র সাত থেকে আটভাগ। অর্থাৎ আছে দরকারের মাত্র তিনভাগের একভাগ। এর মধ্যে ৩০ ভাগ অবৈধ পার্কিং আর দখলদারদের হাতে। বাকি সড়কের ৭০ ভাগ দখল করে চলাচল করে প্রাইভেট কার। আর মাত্র ৩০ ভাগ ব্যবহারের সুযোগ পান গণপরিবহণে চলাচলকারীরা।
বিআরটিএ’র হিসাব অনুয়ায়ী, ঢাকায় এখন ১৫ লাখ ৪১ হাজার ৭৮৫টি নিবন্ধিত মোটরযান রয়েছে। বাস ৩৬ হাজার ৪৪৪টি, মিনিবাস ১০ হাজার ৭৫৭টি। অন্যদিকে প্রাইভেট কার রয়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ২৬৮টি ৷
ঢাকায় এখন ২,২০০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে, যার মধ্যে ২১০ কিলোমিটার প্রধান সড়ক ৷ ট্রাফিক বিভাগ বলছে, যা আছে তার মধ্যেই কম করে হলেও ৩০ ভাগ বা তারও বেশি দখল হয়ে আছে অবৈধ পার্কিং এবং নানা ধরনের দখলদারের হাতে। আর ফুটপাত দখলে থাকায় পথচারীর চাপও নিতে হচ্ছে সড়ককে। ফলে ছোট হচ্ছে সড়ক। কখনও সড়কে তৈরি হয় জনজটও!
স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপি-র হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার মাত্র ১৫ ভাগ যাত্রী সড়কের ৭০ ভাগ দখল করে প্রাইভেট গাড়িতে চলাফেরা করেন। বাকি ৮৫ ভাগ যাত্রীর যাতায়াত গণপরিবহণে। যাদের ভাগে পড়ে সড়কের মাত্র ৩০ ভাগ। বিআরটিএ’র হিসাব অনুয়ায়ী, ঢাকায় এখন ১৫ লাখ ৪১ হাজার ৭৮৫টি নিবন্ধিত মোটরযান রয়েছে। বাস ৩৬ হাজার ৪৪৪টি, মিনিবাস ১০ হাজার ৭৫৭টি ৷ অন্যদিকে প্রাইভেট কার রয়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ২৬৮টি৷
কিন্তু সে যানের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিমাপক যন্ত্রটি ঠিক আছে কি না, সেটাও দেখার বিষয়। কারণ, ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন সড়কে বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই ঘটে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণহীন গতি আর বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে।
এ বিষয়ে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং উইং) মো. নুরুল ইসলাম বলেন, একটি গাড়ির অবশ্যই গতিমাপক মিটার থাকতে হবে। গতিমাপক মিটার না থাকলে একটি গাড়ি কখনোই রাস্তায় চলার অনুমোদন পেতে পারে না।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বিএনএ’কে বলেন, বাস হলো গণপরিবহনের মূল। সেটাকে অবহেলায় রেখে আপনি যদি অন্যগুলোকে ভালো করতে যান, তাহলে যে পরিমাণ উন্নতি দরকার সেটা হবে না। পৌনে দুই কোটি জনসংখ্যার ঢাকা মহানগরীতে শতকরা এক ভাগেরও কম মানুষের প্রাইভেট কার রয়েছে। যার পরিমাণ কিনা মোট গণপরিবহনের তুলনায় অনেক বেশি।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি কামরুল হাসান সোহাগ বিএনএ’কে বলেন, গণপরিবহনভিত্তিক সাধারণ মানুষের চলাচলকে ধনী ব্যক্তিদের প্রাইভেট কারে চলাচলের বিপরীতে প্রাধান্য দিয়ে যদি সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায় এবং প্রকল্প ও বিনিয়োগ সে অনুযায়ী করা যায় তবেই ঢাকার যানজট দ্রুততম সময়ে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

বায়ুদূষণে শীর্ষে, মাত্রা ছাড়ানো শব্দদূষণ
দখলে-দূষণে বিপর্যস্ত ঢাকা শহর ধীরে ধীরে বাসঅযোগ্য হয়ে উঠছে। বর্তমানে পৃথিবীর বাসঅযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান তৃতীয়।
২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বসবাসযোগ্যতার দিক থেকে বিশ্বের ১৪০ শহরের একটি তালিকা প্রকাশ করে ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। এ তালিকায় ১৩৮তম স্থানে জায়গা করে নেয় ঢাকা। ঢাকার পরে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কো এবং সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে নাইজেরিয়ার রাজধানী লাগোস। ২০১৮ সালে বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়।
অন্যদিকে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই) ঢাকার অবস্থান সবসময় উপরের দিকেই থাকে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ ডিসেম্বর দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল শীর্ষে। ঢাকায় তখন বায়ুদূষণের পরিমাণ ছিল ২৩৭ পিএম। দুই সপ্তাহ পর ২৯ ডিসেম্বরের পরিসংখ্যানে এক ধাপ নিচে নামলেও, ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ ১০ দূষিত শহরের মধ্যে নিজের স্থান ধরে রেখেছে দীর্ঘসময় ধরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বায়ুদূষণের পেছনে গাড়ি ও কলকারখানার ধোঁয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। এছাড়া রাজধানীর রাজপথে সারা বছর চলে কোনো না কোনো সেবা সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি, চলে সড়ক সংস্কার কাজ। এ কারণে সড়কের ধুলা-বালিতে দূষিত হচ্ছে ঢাকার বাতাস।
তবে শুধু বায়ুদূষণই নয়, ঢাকার শব্দ ও পরিবেশ দূষণও মাত্রা ছাড়িয়েছে। আইনে রয়েছে, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় যানবাহনে হর্ন বাজানো যাবে না। কিন্তু মানছে কে? নগরীর প্রায় সর্বত্রই গাড়ির হাইড্রোলিক হর্নের বিকট শব্দ নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী।
ঢাকার পরিবেশ দূষণ নিয়ে শুধু সাধারণ নাগরিকরাই নয়, উদ্বিগ্ন সরকারের নীতিনির্ধারক মহলও। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা নগরবাসীর রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কলকারখানার বর্জ্য অবাধে দূষিত করছে ঢাকার নদী-নালা-খালগুলোকে।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বিএনএ’কে বলেন, ‘একটা নালা পরিষ্কার করলে দেখবেন, সেখানে বিচিত্র সব আবর্জনা পাওয়া যায়। পলিথিন থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের মোড়ক-কি নেই সেখানে। এগুলো কারা ফেলে? নগরবাসী এত অসচেতন হলে কাকে দায় দেবেন?’

বর্ষায় জলাবদ্ধতা
জলাবদ্ধতা রাজধানীর অনেক পুরোনো সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সময় নেওয়া হয়েছে নানা প্রকল্প। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। নগরবাসীর অনেকেই বলছেন রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বাস্তবমুখী কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে না। আর এ জন্য নগরীর জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করছে।
রাজধানীতে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বৃষ্টির পানি প্রথমত ভূগর্ভে শোষণ করে নেয়, বাকি পানি রান অব ওয়াটার হয়ে খাল, বিল ও ড্রেন দিয়ে নদীতে চলে যায়। কিন্তু এখানে এই দুই পথের সবই অকার্যকর। তাছাড়া নগরীতে যে ড্রেনগুলো আছে তাও আবর্জনায় পূর্ণ। পানি যাওয়ার পথ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, এ কারণে নগরীর জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করছে।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বিএনএ’কে বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে সবাই নেমে পড়বে। সব ড্রেনেজ সিস্টেম পরিষ্কার করতে হবে। যাতে পানি সরলরেখায় প্রবাহিত হতে পারে। নদী পর্যন্ত এগুলো সচল রাখার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত কর্মদ্যোগ এবং তার বাস্তবায়ন। এটা করতে না পারলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হবে না।’

অপরিকল্পিত নগরায়ন, ভূমিকম্পে কঠিন পরিস্থিতির শঙ্কা
রাজধানীজুড়ে বিধি না মেনে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে একের পর এক ভবন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় সাত মাত্রার উপর ভূমিকম্প হলে বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে। ধসে পড়তে পারে অসংখ্য বহুতল ভবন।
সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাত বা সাড়ে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার সাড়ে তিন লাখ ভবনের মধ্যে ৭০ হাজার ভবন ধসে পড়তে বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রায় একই তথ্য উল্লেখ করে অপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডয়চে ভেলে। জার্মান সংবাদমাধ্যমটির সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং ইউএনডিপি-র দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এ কে এম মাকসুদ কামাল জানান, ২০০৯ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মধ্যে ভবনগুলো নিয়ে জরিপ করা হয়। তাতে দেখা যায় যে, আগামীতে যদি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয় তাহলে তিন লাখ ২৬ হাজার ভবনের মধ্যে ৭২ হাজার ভবন তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়বে। একেবারে অক্ষত থাকবে খুব কম সংখ্যক ভবন।
‘এছাড়া গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইনে বিস্ফোরণ ঘটে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে৷ ঘটবে মানবিক বিপর্যয়ও,’ যোগ করেন তিনি।

বিএনএনিউজ/এফএইচ, জেডএইচ

Print Friendly and PDF

ট্যাগ :

ঢাকা

আরো সংবাদ

আর্কাইভ
February 2020
FSSMTWT
« Jan  
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031